
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানিয়েছে, চলতি বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে শক্তিশালী এল নিনো তৈরির সম্ভাবনা ৮১ শতাংশ। এটি ১৯৫০ সালের পর রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো ঘটনাগুলোর একটি হতে পারে। বাজার বিশ্লেষকেরা এর সম্ভাব্য তীব্রতার কারণে একে ‘সুপার এল নিনো’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর দেখা দেওয়া এল নিনোর কারণে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে খরা এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে অতিবৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়ে খাদ্য সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উদীয়মান অর্থনীতিগুলো এ ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ এসব দেশের মানুষের আয়ের বড় অংশ খাদ্য কিনতে ব্যয় হয় এবং কৃষি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘ সময় কঠোর নীতি ধরে রাখতে হতে পারে।
ওয়েলিংটন ম্যানেজমেন্টের ফিক্সড ইনকাম পোর্টফোলিও ম্যানেজার জিলিয়ান এজওয়ার্থ বলেন, চলতি বছরের শুরুতে অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর সুযোগ দেখলেও এখন পরিস্থিতি বদলেছে। কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদ কমানো বন্ধ করেছে, আবার কেউ কেউ বাড়ানোর পথে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “বছরের দ্বিতীয়ার্ধে উদীয়মান বাজারগুলোতে দ্রুত সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা কম।”
এল নিনোর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি ভারত। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এই দেশটির কৃষি ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বর্ষার ওপর নির্ভরশীল। দেশটির বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে মৌসুমি বৃষ্টি থেকে।
ভারতের আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে ফসল উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি খাদ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় চাল রপ্তানিকারক এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম চিনি উৎপাদনকারী দেশ ভারত অতীতে খাদ্য মজুতের কারণে এল নিনোর ধাক্কা সামাল দিতে পেরেছে। তবে মূল্যস্ফীতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ওপরে থাকায় শক্তিশালী এল নিনো হলে দেশটিকে আবারও কঠোর মুদ্রানীতি নিতে হতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্যের কারণে এমনিতেই এশিয়ার অনেক দেশ অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে এল নিনো যুক্ত হলে খাদ্য ও জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছরে এরই মধ্যে সুদের হার বাড়িয়েছে। তীব্র এল নিনো হলে আগামী বছর পর্যন্ত এ অঞ্চলে ঋণের খরচ বেশি থাকতে পারে।
অলস্প্রিং গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্টসের ইক্যুইটি পোর্টফোলিও ম্যানেজার গ্যারি ট্যান বলেন, এল নিনো মূল্যস্ফীতিকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।
তিনি বলেন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো এল নিনোর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দুর্বল মুদ্রার কারণে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়লে এশিয়ার দেশগুলোর আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। এরই মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়া ও ভারতের রুপি রেকর্ড নিম্নস্তরের কাছাকাছি রয়েছে।
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে কলম্বিয়া এল নিনোর বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। কম বৃষ্টিপাত দেশটির কৃষি উৎপাদন ও বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে।
কলম্বিয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ জলবিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। জলাধারে পানির পরিমাণ কমে গেলে ব্যয়বহুল তাপবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়াতে হয়, যার প্রভাব পড়ে বিদ্যুতের দাম ও মূল্যস্ফীতিতে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের অর্থনীতিবিদ ড্যান প্যান বলেন, এল নিনোর কারণে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে কলম্বিয়া অন্যতম।
পেরুর কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সতর্ক করেছে, এল নিনোর প্রভাবে চলতি বছরে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে মাছ ধরা ও কৃষি খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে লাভবান হতে পারে। এতে শস্য উৎপাদন, রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়তে পারে।
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এল নিনোর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। কেনিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো কৃষি উৎপাদনে আবহাওয়াজনিত সমস্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। খরার কারণে খাদ্য সংকট ও মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে এল নিনোকে মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর আগে বড় ধরনের এল নিনো পরিস্থিতিতে খাদ্যের দাম দেশটির মূল্যস্ফীতিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল সতর্ক করেছে, জলবায়ুজনিত সংকট তীব্র হলে কিছু আফ্রিকান দেশের অর্থনীতি ও ঋণমান চাপের মুখে পড়তে পারে।
তবে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে এল নিনোর প্রভাব তুলনামূলক কম। ফলে পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ার মতো দেশে সুদের হার কমানোর প্রত্যাশা এখনও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘সুপার এল নিনো’ শুধু আবহাওয়ার সমস্যা নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য নতুন বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স