
প্রতিবেদনে বলা হয়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। অতিরিক্ত গরমের কারণে প্রতিবছর ঢাকায় মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ কার্যত নষ্ট হচ্ছে, যা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানের সমপরিমাণ।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৮০ সালের মধ্যে ঢাকায় উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা ক্ষতির হার বেড়ে ৭.৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট এই তাপপ্রবাহ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন (আইএফসি) এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের যৌথ বিশ্লেষণ উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপজনিত উৎপাদনশীলতা হ্রাস মোকাবিলা করা না গেলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক খাত ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৫৮০ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় হারাতে পারে।
তবে বিশ্বব্যাংক মনে করে, সময়োপযোগী ও লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগের মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৬ সালে সরকার গঠিত গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ ও পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। আইএফসির পার্টনারশিপ ফর ক্লিনার টেক্সটাইল কর্মসূচি এবং টেকসই অর্থায়নের সহায়তায় এই উদ্যোগ আরও সম্প্রসারিত হয়েছে।
এর ফলে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব ‘লিড’ (LEED) সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানার সংখ্যা ২৭০টি ছাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি আরও বলছে, অতিরিক্ত গরমের কারণে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকদের ওপর কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানির ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় চরম তাপপ্রবাহের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি অন্তত ৭ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
এছাড়া পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অন্তত ৫২ কোটি মানুষ বছরে অন্তত এক মাস মারাত্মক ও বিপজ্জনক তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হবেন, যা বর্তমানের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।
গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে, আর শ্রীলঙ্কায় এই হার প্রায় চার গুণ বেড়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, চরম গরম ইতোমধ্যেই শ্রম উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা দুর্বল করছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন নিম্নআয়ের মানুষ, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, নারী, শিশু ও বয়স্করা।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, তাপসহনশীল ও জলবায়ু-সহনশীল শহর গড়ে তোলা শুধু মানুষকে গরম থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয় নয়; এটি কর্মসংস্থান রক্ষা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শহরগুলোকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে ধরে রাখারও অন্যতম শর্ত।
তার মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও বাসযোগ্য, টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক শহর গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।