
বুধবার (৫ আগস্ট) শুরু হয়েছে তাইওয়ানের সবচেয়ে বড় বার্ষিক সামরিক মহড়া 'হান কুয়াং'। ১০ দিনব্যাপী এই মহড়ার মূল লক্ষ্য, চীন যদি কখনও শক্তি প্রয়োগ করে তাইওয়ান দখলের চেষ্টা করে, তাহলে কীভাবে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে, তার বাস্তবসম্মত প্রস্তুতি নেওয়া।
গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড বলে দাবি করে বেইজিং। প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকিও বহুবার দিয়েছে চীন।
প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র কারেন কুও বলেন, মহড়ায় প্রেসিডেন্ট ও তার দল প্রতিরক্ষামূলক অভিযান পরিচালনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিভিন্ন অনুশীলনে অংশ নেন।
তার ভাষ্য, এই অনুশীলনের মাধ্যমে কমান্ড কাঠামো, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বয় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে, যাতে যেকোনো অপ্রত্যাশিত সংকটেও সরকার কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে।
২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট হিসেবে এবারই প্রথম 'ওয়ান চুন' (Wan Chun) নামে পরিচিত এই বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনায় অংশ নিলেন লাই। যুদ্ধ বা বড় ধরনের জাতীয় সংকট দেখা দিলে রাষ্ট্রপ্রধানকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার এই পরিকল্পনার সূচনা হয় শীতল যুদ্ধের সময়।
সে সময়ের প্রেসিডেন্ট চিয়াং কাই-শেক তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মাও সেতুংয়ের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করেছিলেন।
১৯৪৯ সালে গৃহযুদ্ধে পরাজিত হয়ে চিয়াং কাই-শেক ও তার রিপাবলিক অব চায়না সরকার তাইওয়ানে আশ্রয় নেন। অন্যদিকে মাও সেতুং প্রতিষ্ঠা করেন গণপ্রজাতন্ত্রী চীন। এরপর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে আজও কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি হয়নি।
তাইওয়ান দীর্ঘদিন ধরেই আশঙ্কা করে আসছে, সম্ভাব্য যুদ্ধের শুরুতেই চীন প্রেসিডেন্টসহ শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে তথাকথিত 'ডিক্যাপিটেশন' বা নেতৃত্ব নির্মূল অভিযান চালাতে পারে।
২০২৩ সালে তাইওয়ানের চারপাশে চীনের সামরিক মহড়ার সময় দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছিল, তাদের অনুশীলনের একটি অংশ ছিল নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে 'শিরশ্ছেদ অভিযান' পরিচালনার প্রস্তুতি।
হান কুয়াং মহড়ার অংশ হিসেবে তাইওয়ানের বিভিন্ন এলাকায় সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রয়টার্সের সাংবাদিকরা রাজধানী তাইপেতে সংশান বিমানবন্দর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি তিয়েন-কুং-৩ (Tien-Kung III) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন থাকতে দেখেছেন।
ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য এই ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমান উভয়ই ভূপাতিত করতে সক্ষম।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পরিবেশ তৈরি করে সেনাদের প্রতিক্রিয়া ও যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়াতেই ধারাবাহিক পরিস্থিতিভিত্তিক এই মহড়া পরিচালিত হচ্ছে।
মহড়ার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে সম্ভাব্য অবরোধ মোকাবিলা, উপকূলীয় পাল্টা হামলা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সুরক্ষা এবং পুরো সমাজকে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করা।
এরই অংশ হিসেবে আগামী সপ্তাহে প্রথমবারের মতো ইচ্ছাকৃতভাবে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে পরীক্ষা চালাবে তাইওয়ান। দুর্যোগ বা সম্ভাব্য চীনা আগ্রাসনের সময় ব্যান্ডউইথ সীমিত হয়ে গেলে নাগরিকরা কীভাবে যোগাযোগ বজায় রাখবেন, সেটিই এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
তাইওয়ানের সামরিক মহড়া নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি চীনের সেনাবাহিনী। তবে দ্বীপটির চারপাশে তাদের সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত রয়েছে।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দ্বীপটির আশপাশে চীনের ১৪টি সামরিক বিমান এবং ৯টি যুদ্ধজাহাজ শনাক্ত করা হয়েছে।
বেইজিং প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তেকে 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' আখ্যা দিয়ে তার বারবার আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে লাই চিং-তে স্পষ্ট করে বলেছেন, তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল তাইওয়ানের জনগণেরই রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স