
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ২৬ আগস্ট সকালে নেপালের ভোটেকোশী নদীতে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। এতে উত্তর ও মধ্য নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহের বড় অংশ ভেঙে নিচে নেমে আসে। প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় বরফ, শিলাখণ্ড ও পলি-কাদা আছড়ে পড়ায় তীব্র কম্পনও অনুভূত হয়। কম্পনের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ২।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়ার সঙ্গে পাহাড়ের শিলাস্তরও ধসে যায়। হিমবাহ ও শিলাখণ্ড পাহাড় বেয়ে নিচে নামার সময় ঘর্ষণের ফলে বরফ গলতে থাকে। পরে ভেঙে পড়া শিলাখণ্ড লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে দেয়। সেখানে তৈরি হয় অস্থায়ী একটি হ্রদ। শেষ পর্যন্ত সেই হ্রদের পাড় ভেঙেই কাদামিশ্রিত পানির ভয়াবহ স্রোত নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি গ্রেনোবল আল্পসের অধ্যাপক ক্রিস্টেন কুক জানান, হিমবাহের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ শিলাখণ্ডও নিচে নেমে এসেছিল। ফলে বিপর্যয়ের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করছেন, এই ধরনের হিমবাহ ধসের পেছনে পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার ভূমিকা রয়েছে। উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে, পাশাপাশি পাহাড়ের ওপরে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন হিমবাহ-হ্রদ। এসব হ্রদের বাঁধ বা পাড় ভেঙে গেলে ভয়াবহ বন্যা নেমে আসতে পারে।
২০১৯ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, হিমালয় অঞ্চলের প্রায় ২১০টি হিমবাহ-হ্রদ ভবিষ্যতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এসব হ্রদের কোনোটি ভেঙে গেলে নিচের জনপদ ও অবকাঠামোতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।
তবে শুধু হিমালয় নয়, নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড, আইসল্যান্ড, চিলি ও আন্দিজ পর্বতেও একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন।
হিমবাহ ধসের ভয়াবহতা শুধু আকস্মিক বন্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কোনো সংকীর্ণ ও পানিপূর্ণ গিরিখাতে বিপুল পরিমাণ বরফ ও শিলা একসঙ্গে আছড়ে পড়লে তৈরি হতে পারে ‘মেগাসুনামি’।
২০২৩ সালে পূর্ব গ্রিনল্যান্ডে গারগানটুয়ান হিমবাহের একটি বড় অংশ ধসে পড়লে গিরিখাতে প্রায় ৬৫০ ফুট উঁচু ঢেউ তৈরি হয়েছিল। এর অভিঘাতে আশপাশের পাহাড়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২৫ সালে আলাস্কাতেও হিমবাহ ধসের পর প্রায় ১ হাজার ৫৮০ ফুট উঁচু ঢেউ তৈরি হয়েছিল। একই বছর মে মাসে সুইজারল্যান্ডের আল্পসের লোৎসচেন উপত্যকায় বার্চ হিমবাহের বড় অংশ ভেঙে পড়ে। সঙ্গে নেমে আসে বিপুল পরিমাণ শিলা ও পাথর। এতে প্রায় ২ কোটি টন পাথর ও ধ্বংসাবশেষে ব্ল্যাটেন গ্রামের বড় অংশ চাপা পড়ে।
তবে আগাম সতর্কতার মাধ্যমে প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব, এর বড় উদাহরণ সুইজারল্যান্ডের ব্ল্যাটেন। বিপর্যয়ের নয় দিন আগেই বাসিন্দা ও তাদের পোষ্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ফলে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হলেও কোনো প্রাণহানি হয়নি।
কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যাল্টন বায়ার্স মনে করেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। আগাম সতর্কতা জারি করা গেলে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এজন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ-হ্রদগুলো আগে থেকেই চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি চালানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
তবে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নরওয়েজিয়ান জিওটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের গবেষক বেঞ্জামিন বেলওয়াল্ড বলেন, আল্পসের তুলনায় হিমালয় অনেক বিস্তৃত এলাকা। এত বড় অঞ্চলের প্রতিটি হিমবাহ-হ্রদ পর্যবেক্ষণ করা সহজ নয়। আবার সব হিমবাহ ধসের আগে স্পষ্ট সংকেতও দেয় না।
নেপালের বিজ্ঞানী মোহনবাহাদুর চাঁদ মনে করেন, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলো বেশির ভাগই উন্নয়নশীল। তাদের পক্ষে এত বড় নজরদারি অবকাঠামোর ব্যয় বহন করা কঠিন। একই সঙ্গে এসব এলাকায় জনসংখ্যা বাড়ছে। ফলে বড় ধরনের বিপর্যয় হলে প্রাণহানির ঝুঁকিও অনেক বেশি।
বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো নিশ্চিত নয়; কোথায়, কখন পরবর্তী হিমবাহ ধস নামবে। তবে একটি বিষয়ে তারা প্রায় একমত, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহজনিত বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। আর হিমালয়ের দুর্গম ফাঁকফোকরে থাকা এসব হিমবাহ-হ্রদই ভবিষ্যতের বড় বিপর্যয়ের ‘টাইম বোমা’ হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা