
চীনের সীমান্তবর্তী রাসুয়া ও আশপাশের জেলাগুলোতে হিমালয়ের উচ্চাঞ্চলে বরফ ও পাথরের ধসের পর আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। এতে উত্তর ও মধ্য নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রাণহানির পাশাপাশি ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখনো প্রায় ৫ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৫৮৯ জন বিদেশি নাগরিক।
রাসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিংসহ ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকার বিভিন্ন এলাকায় বন্যায় নিহতদের স্মরণে সরকার ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করে। দুর্যোগের ১৩তম দিনে এ শোক পালন করা হচ্ছে। হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর ১৩তম দিনকে শোক পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এদিন মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি কামনায় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালন করা হয় এবং অনেক সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক শোকপর্বের সমাপ্তি ঘটে।
নেপালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোববার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, জাতীয় শোক উপলক্ষে দেশটির সব সরকারি দপ্তর এবং বিদেশে অবস্থিত নেপালি দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে।
বন্যায় ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সরকারি কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে এখনো উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান চলছে। নিখোঁজদের সন্ধান এবং মরদেহ উদ্ধারে নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি বিশেষায়িত আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলও কাজ করছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের ভেতরেও অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।
দুর্যোগে অন্তত ৩২ হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রায় ৭ হাজার ৫০০টি ঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। মধ্য নেপালের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের জীবিকা ও জরুরি অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে নেপাল সরকার সেনাবাহিনী, পুলিশ, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থাকে মোতায়েন করেছে। নিখোঁজদের উদ্ধারে প্রতিবেশী দেশগুলোর বিশেষায়িত দলও যোগ দিয়েছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকা পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারে ভারতসহ কয়েকটি দেশের বিশেষজ্ঞ দলও কাজ করছে।
এদিকে, জেন-জি শহীদ দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে নেপাল সরকার।
গত বছরের একই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের সরকারি সিদ্ধান্ত, দুর্নীতির অভিযোগ এবং প্রভাবশালী রাজনীতিক ও কর্মকর্তাদের সন্তানদের বিলাসী জীবনযাপনের প্রতিবাদে কাঠমান্ডুতে জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। পরে পার্লামেন্ট ভবনের কাছে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। এতে শিশুসহ ৭২ জন নিহত হন।
পরিস্থিতির একপর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করেন। এরপর পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হয় এবং সিপিএন-ইউএমএল ও নেপালি কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে। পরে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। চলতি বছরের ৫ মার্চ নতুন করে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
ওই নির্বাচনে জেন-জি সমর্থিত রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন রবি লামিছানে। আর কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
বন্যায় নিহতদের স্মরণে সোমবার জাতীয় শোক পালনের পাশাপাশি মঙ্গলবার জেন-জি শহীদ দিবস পালন করবে নেপাল। একদিকে ভয়াবহ বন্যার পর উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম এখনো চলছে, অন্যদিকে গত এক বছরে দেশটির ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ও বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেই পালিত হচ্ছে এই দুটি কর্মসূচি।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে