
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকালে ইন্দোনেশিয়ার পরিবহনমন্ত্রী ডুডি পুরওয়াগান্ধি জানান, আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের কারণে জাকার্তায় সেবা দেওয়া দুটি বিমানবন্দরসহ মোট আটটি বিমানবন্দর বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে জাকার্তার প্রধান বিমানবন্দর সোকার্নো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও রয়েছে।
জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপের মাঝামাঝি প্রণালিতে অবস্থিত আনাক ক্রাকাতোয়া গত শুক্রবার রাতে অগ্ন্যুৎপাত শুরু করে। এরপর আগ্নেয়গিরির ছাই জাকার্তা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বিমানবন্দরগুলোতে কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোববার পর্যন্ত আটটি বিমানবন্দরে ১ হাজার ৫৫৮টি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। এসব ফ্লাইটের কারণে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। এর মধ্যে ৯০০টির বেশি ফ্লাইট সোকার্নো-হাত্তা বিমানবন্দর থেকে ছেড়েছে বা সেখানে অবতরণের কথা ছিল। জাকার্তার প্রধান বিমানবন্দরের কার্যক্রম সোমবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এক ইনস্টাগ্রাম পোস্টে এ তথ্য জানিয়েছে।
পরিবহনমন্ত্রী ডুডি পুরওয়াগান্ধি বলেন, ‘আবহাওয়ার পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল হওয়ায় এই পরিস্থিতি কখন শেষ হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।’ তিনি জানান, জাকার্তার পার্শ্ববর্তী লামপুং ও পশ্চিম জাভা প্রদেশে অবস্থিত বিমানবন্দরসহ অন্য সাতটি বিমানবন্দর অন্তত সোমবার সকাল ৮টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত বন্ধ রাখার পরিকল্পনা ছিল।
এদিকে, ছাইয়ের কারণে জাকার্তার স্কুলগুলোর কার্যক্রমেও প্রভাব পড়েছে। নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার রাজধানীর স্কুলগুলোর ক্লাস অনলাইনে নেওয়া হয়েছে। তবে কতদিন এ ব্যবস্থা চলবে, তা জানানো হয়নি। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে কিছু নৌযান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটেছে।
ভূতাত্ত্বিক সংস্থা জানিয়েছে, শনিবার আনাক ক্রাকাতোয়ার অগ্ন্যুৎপাতে লাভার ফোয়ারা দেখা যায় এবং বিকট শব্দ শোনা যায়, যা কয়েকশ কিলোমিটার দূর থেকেও অনুভূত হয়েছে। রোববারও কয়েক দফা অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে। পর্যবেক্ষণ সংস্থার ওয়েবসাইট অনুযায়ী, সর্বশেষ অগ্ন্যুৎপাতটি হয় রোববার রাত ৮টা ২৩ মিনিটে।
সোমবার সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, ‘আগামী দিনগুলোতে আরও অগ্ন্যুৎপাতের সম্ভাবনা এখনও বেশি।’ সোকার্নো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসংলগ্ন আকাশসীমায় আগ্নেয়গিরির ছাই শনাক্ত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করে। এতে অনেক যাত্রীকে বিকল্প ফ্লাইট খুঁজতে হয়েছে।
৪৪ বছর বয়সী ব্যবসায়ী হেনি ইয়েনসান তার মাকে নিয়ে নিজ শহরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তাকে নতুন করে মঙ্গলবারের টিকিট নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সবাই হতাশ হয়েছিল।’ তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় কেউ ক্ষুব্ধ হননি বলেও জানান তিনি।
আগ্নেয়গিরির ছাই সুমাত্রার দক্ষিণ প্রান্তের বান্দার লামপুং শহরেও পৌঁছেছে। এতে পার্ক করে রাখা গাড়ি ও রাস্তার পাশের বিভিন্ন স্থান ছাইয়ে ঢেকে যায়।
‘ক্রাকাতোয়ার সন্তান’ অর্থের আনাক ক্রাকাতোয়া জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপকে পৃথক করা প্রণালিতে অবস্থিত। আগ্নেয়গিরির কার্যক্রমের কারণে ওই পথে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নৌপথের নিরাপত্তার বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগ্নেয়গিরিকে ঘিরে ৩ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের নিষিদ্ধ এলাকায় কোনো নৌযান প্রবেশ করতে পারবে না।
গত শতকের শুরুতে সমুদ্র থেকে জেগে ওঠা আনাক ক্রাকাতোয়া ১৮৮৩ সালে ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতের পর তৈরি হওয়া বিশাল গহ্বরের মধ্যে অবস্থিত। ওই অগ্ন্যুৎপাত ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে আনুমানিক ৩৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
ভূতাত্ত্বিক সংস্থার প্রধান লানা সারিয়া আনাক ক্রাকাতোয়ার কাছাকাছি না যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছেন। তার ভাষ্য, আগ্নেয়গিরি থেকে ছিটকে বের হওয়া বিভিন্ন পদার্থ নিষিদ্ধ এলাকায় থাকা মানুষের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তবে সাম্প্রতিক অগ্ন্যুৎপাত থেকে সুনামি সৃষ্টির আশঙ্কা নেই বলেও তিনি জানান।
২০১৮ সালে আনাক ক্রাকাতোয়ার একটি অংশ ধসে সৃষ্ট সুনামিতে ৪২৯ জন নিহত হন। ওই ঘটনায় হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপ রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ার’-এ অবস্থিত। টেকটোনিক প্লেটগুলোর সংঘর্ষের কারণে এ অঞ্চলে ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা তুলনামূলক বেশি।
সূত্র: গার্ডিয়ান