
সম্প্রতি এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক থেকে পদত্যাগ করা কক্সন বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। এর আগে এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে তার পদত্যাগের ঘোষণাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ নিয়ে বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মধ্যেই তার এই বক্তব্য সামনে এলো।
২৭ বছর বয়সী কক্সন বলেন, বর্তমান গতিতে এআই উন্নয়নের গতি কমানো না হলে অদূর ভবিষ্যতে মানবজাতির অস্তিত্ব বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তিনি বলেন, এআই নিয়ে কাজ করা অনেকেই সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে ‘সত্যিই ভয় পাচ্ছেন’। কক্সনের সাবেক প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেইও সম্প্রতি এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তার এই অবস্থানের উদ্দেশ্য নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন।
এআই খাতের আরেক দুই বড় প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই ও এক্সএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যান ও ইলন মাস্কও শিল্পখাতজুড়ে এআই উন্নয়নের গতি কমানো, নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং এআই মডেল তৈরির প্রক্রিয়ায় স্বাধীন নজরদারির পক্ষে মত দিয়েছেন।
বিবিসির ‘সানডে উইথ লরা কুয়েন্সবার্গ’ অনুষ্ঠানে কক্সন বলেন, এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীরা নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানাচ্ছেন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে। কারণ তারা নিজেদের এমন এক প্রতিযোগিতার মধ্যে আটকে পড়া অবস্থায় দেখছেন, যার পরিণতি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। কক্সনের মতে, সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হলো—এআই-নির্ভর একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখতে কেমন হতে পারে।
আমোদেই তার বক্তব্যে যে ঝুঁকিগুলোর কথা বলেছেন, তার একটি হলো এমন বিপুলসংখ্যক বটের সমন্বিত কার্যক্রম, যা একটি সুপারকম্পিউটারের মতো কাজ করে ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। কক্সনের মতে, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই এমন পরিস্থিতি বাস্তবসম্মত হয়ে উঠতে পারে। কক্সনের পদত্যাগের বিষয়ে অ্যানথ্রপিকের এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, এআই বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি নজিরবিহীন ঝুঁকিও তৈরি করবে—এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটি সবসময় স্বচ্ছভাবে জানিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় তারা শিল্পখাতের সবচেয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থাগুলোর কিছু ব্যবহার করে এআই মডেল তৈরি করছে। এআই মডেল কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে গবেষণাতেও অ্যানথ্রপিক অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
তিনি বলেন, এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে পরিকল্পনা করছেন এবং তাদের কাজের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ভাবছেন। এমনকি দ্রুত এআই অগ্রগতির কারণে তৈরি হতে পারে এমন অস্থিরতা নিয়ে এতটাই উদ্বিগ্ন যে কেউ কেউ নিরাপদ কোনো জায়গায় জমি কেনার কথাও ভাবছেন। কক্সনের ভাষায়, প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার সময় এসব আশঙ্কা তাদের অনেকের মাথায় প্রতিদিনই ঘুরছে।
তবে এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে কক্সন পুরোপুরি হতাশ নন। তিনি বলেন, প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণাকারীরা এআইয়ের ইতিবাচক দিকগুলোও দেখতে চান। রোগ নিরাময়ে সহায়তা করা এবং মানুষের জীবনমান উন্নত করার মতো সম্ভাবনাগুলো নিয়েও তারা আশাবাদী।
‘এআইয়ের গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও নোবেল পুরস্কার বিজয়ী জিওফ্রি হিন্টনও বিবিসিকে বলেছেন, এআইয়ের কারণে মানবজাতি নিশ্চিহ্ন হওয়ার ১০ শতাংশ সম্ভাবনা থাকা ‘অযৌক্তিক নয়’। তবে এআই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ফ্যাকাল্টির প্রধান নির্বাহী মার্ক ওয়ার্নার বলেন, এআইয়ের কারণে সব মানুষ মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কত শতাংশ—তা নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন। তবে যারা এমন আশঙ্কা করছেন, তারা নিজেদের বক্তব্যে আন্তরিক—এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও অ্যানথ্রপিকের অর্থের বিনিময়ে পরামর্শক হিসেবে কাজ করা ঋষি সুনাকও ‘সানডে টাইমস’-এ লিখেছেন, সাধারণভাবে এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হলেও মানবতার জন্য এর ঝুঁকি নিয়ে তিনিও উদ্বিগ্ন।
এদিকে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংও গত সপ্তাহে গোল্ডম্যান স্যাকস আয়োজিত এক সম্মেলনে কক্সনের মন্তব্য নিয়ে কথা বলেন বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন সেখানে উপস্থিত কয়েকজন। তাদের দাবি, হুয়াং এসব মন্তব্যকে সত্য নয় বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। এর আগে হুয়াং বলেছিলেন, এআই ‘মানবজাতির সমাপ্তি ঘটাবে’—এমন ধারণা সম্পূর্ণ অর্থহীন।
এনভিডিয়া এআই প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় চিপ তৈরি করে। ফলে এআই খাতের দ্রুত সম্প্রসারণে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে। হুয়াংয়ের মন্তব্যকে তাই সিলিকন ভ্যালিতে এআইয়ের সম্ভাব্য অস্তিত্বগত ঝুঁকি নিয়ে বর্তমান ও সাবেক কর্মীদের সতর্কবার্তার বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে সমালোচকদের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, অ্যানথ্রপিক প্রতিযোগীদের ঠেকাতে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা জোরদারের চেষ্টা করছে। তাদের মতে, এতে অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের মধ্যে এআই খাতে এক ধরনের দ্বৈত আধিপত্য তৈরি হতে পারে। অ্যানথ্রপিক শেয়ারবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার কেনার সুযোগ পাবেন।
অন্যদিকে সর্বশেষ ৮৫২ বিলিয়ন ডলার মূল্যায়ন পাওয়া ওপেনএআইও আইপিওতে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় ছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান স্যাম অল্টম্যান শুক্রবার জানিয়েছেন, চলতি বছর ওপেনএআইয়ের আইপিও হচ্ছে না। এ সিদ্ধান্তের পেছনে তিনি নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলোর কথাও উল্লেখ করেছেন।
সূত্র: বিবিসি