
চাওয়া-পাওয়ার হিসেব তো মিলে গেছে অনেক আগেই। উপলক্ষটা ছিলো শুধু প্রিয় সমর্থকদের সামনে থেকে বিদায় নেওয়ার। সেই আনুষ্ঠানিকতা সারতেই বুয়েন্স আইরেসের স্মৃতি বিজারিত স্তাদিও মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় ভোরে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলতে নামেন ফুটবলের মহাতারকা মেসি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো।
অনেক আগেই পূর্ন হয়ে যাওয়া গ্যালারির চারদিক থেকে ভেসে আসে ভক্তদের উল্লাস ধ্বনি। তাদের কারো হাতে মেসির ছবি, কারো হাতে আবার মেসিকে নিয়ে লেখা প্ল্যাকার্ড। ক্যামেরার চোখ বারবার খুঁজে নেয় মহাতারকাকে এবং আবেগপ্রবণ দর্শকদের। মাঠে মেলে ধরা হয় ঢাউস আকৃতির মেসি লেখা জার্সি। আতশবাজির ছটায় আলোকিত হয় চারপাশ। জাতীয় সঙ্গীতের সময় অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে মেসির চোখ।
নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট পর শুরু হয় মাঠের লড়াই। শেষবারের মতো দেশের জন্য বল পায়ে ছুটলেন মেসি। সপ্তম মিনিটেই গোল পেতে পারতেন। তবে দূর থেকে নেওয়া তার বাঁ-পায়ের শট ঝাঁপিয়ে আটকে দেন বেনিন গোলরক্ষক। তিন মিনিট পর ঘড়ির কাঁটা ১০ মিনিট ছুঁতে থেমে যায় খেলা। আরেকবার আতশবাজির শব্দে মুখরিত হয় চারপাশ। দুই দলের সব খেলোয়াড়, কোচ, এবং হাজারো দর্শক হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানান বিশ্বকাপজয়ী তারকাকে।
শক্তি-সামর্থ্য এবং ফিফা র্যাংকিংয়ে দুই দলের মধ্যে পার্থক্য পাহাড়সম হলেও বেনিন বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই খেলতে থাকে। ২৫ মিনিটে ডি-বক্স থেকে বেশ দূরে ফ্রি কিক পায় আর্জেন্টিনা। মেসির লক্ষ্যে থাকা শট আটকে দেন গোলরক্ষক। তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের আটকে রেখেই বিরতিতে যায় পশ্চিম আফ্রিকার দলটি।
দ্বিতীয়ার্ধের তৃতীয় মিনিটে ‘ডেডলক’ ভাঙে। মেসির কর্নারে উড়ে আসা বল ছয় গজ বক্সের মুখ থেকে নিখুঁত ভলিতে জালে পাঠান নিকোলাস ওতামেন্দি। গত বিশ্বকাপের পর অবসর নেওয়া এই অভিজ্ঞ সেন্টার ব্যাককেও ঘরের মাঠ থেকে বিদায় নেওয়ার সুযোগ করে দেয় আর্জেন্টিনা।
৬১ মিনিটে মেসির পাস পেয়ে চমৎকার গোলে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন নিকো পাজ। তাতে ম্যাচের ফল নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে যায়।
আকাশী নীল-সাদা জার্সিতে মেসির পায়ে আরেকটি গোল দেখার অপেক্ষায় থাকা সমর্থকদের নিরাশ করেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ৭১ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আগুস্তিন জিয়াই ডি-বক্সে ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। জোরাল স্পট কিকে জালে বল পাঠিয়ে দর্শকদের দিকে ছুটে যান মেসি। তার চোখে-মুখে উচ্ছ্বাসের ঢেউ ছিল না, তবে তাকে ঘিরে সতীর্থদের উল্লাস ছিলো দেখার মতো।
খানিক পর দ্বিতীয় গোলও পেতে পারতেন মেসি। কিন্তু ছয় গজ বক্সের বাইরে ফাঁকায় বল পেয়েও অবিশ্বাস্যভাবে তা বাইরে মেরে বসেন। একেবারে শেষ সময়ে আরেকটি ফ্রি কিক পায় আর্জেন্টিনা। মেসির সেই প্রচেষ্টা উড়ে যায় ক্রসবারের ওপর দিয়ে। এরপরই বাজে শেষের বাঁশি। থেমে যায়, জাতীয় দলের হয়ে ৩৯ বছরের মেসির পথচলা।
কোপা আমেরিকা-বিশ্বকাপ-কোপা আমেরিকা জয়ের অনন্য চক্র পূরণ করে, ২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল ও ৬৯টি অ্যাসিস্ট নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ করলেন ফুটবলের মহাতারকা, জাদুকর, জীবন্ত কিংবদন্তী. লিওনেল মেসি। ২২ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে দেশকে যা দিয়ে গেছেন, তা কখনোই ভুলবে না ফুটবলপাগল আর্জেন্টাইনরা।