
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত পৌনে ৮টার দিকে মারা যান আরিফ। তিনি গাইবান্ধা শহরের ডেভিড কোম্পানিপাড়ার বাসিন্দা। তার হবু স্ত্রীর বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় এলাকায়।
পরিবার ও এলাকাবাসী জানান, সম্প্রতি ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেন আরিফ। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিও করতেন তিনি। বিয়ের প্রস্তুতির জন্য প্রায় এক মাস আগে ঢাকা থেকে বাড়িতে আসেন। দুই পরিবারে চলছিল বিয়ের আয়োজন। কনের বাড়ির ফটক ও ঘর সাজানো হয়েছিল বর বরণের জন্য। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিলি করা হয়েছিল দাওয়াতপত্র।
বৃহস্পতিবার রাতে ছিল আরিফের গায়েহলুদের অনুষ্ঠান। অথচ সেই সময় বিয়ের আনন্দে মাতোয়ারা হওয়ার বদলে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গাইবান্ধা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের কফিনে রাখা ছিল তার নিথর দেহ।
সংগঠনটির পরিচালক কায়সার প্লাবন বলেন, শনিবার দুপুরে একটি কমিউনিটি সেন্টারে আরিফের বউভাতের আয়োজন ছিল। কিন্তু মুহূর্তেই সবকিছু শেষ হয়ে গেল।
পরিবারের ধারণা, আরিফ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার বড় বোন শারমিন সুলতানা শহরের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করেছেন।
শারমিন জানান, চার দিন আগে জ্বরে আক্রান্ত হন আরিফ। শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে তাকে হাসপাতাল রোডের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হয়। তার অভিযোগ, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বেলা ১টার দিকে চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দেন। ওষুধ নিয়ে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়।
বিকালে আরিফের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে তাকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। শারমিনের অভিযোগ, জরুরি বিভাগের সামনে প্রায় এক ঘণ্টা তাকে রিকশায় বসিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা করেন। রাত পৌনে ৮টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাজমুল হুদা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। শুক্রবার সকালে পরিবারের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ওই দিন দুপুরে আরিফের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। আগের রাতেই তার মৃত্যু হয়। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যায়নি।
এদিকে, মাইশা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক কাইয়ুম মিয়া চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আরিফ তার পরিচিত ছিলেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে ওই কেন্দ্রে নেওয়া হলে চিকিৎসক মনির হোসেন গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা তাকে হাসপাতালে ভর্তি না করে বাড়িতে নিয়ে যান। পরে অবস্থার অবনতি হলে সন্ধ্যায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক মেহেদী হাসান বলেন, আরিফকে হাসপাতালে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। স্বজনদের বর্ণনা ও আগের পরীক্ষার প্রতিবেদন দেখে তার কয়েক দিন ধরে টাইফয়েডে আক্রান্ত থাকার বিষয়ে ধারণা পাওয়া গেছে। তার ভাষ্য, আরিফের ডেঙ্গুর উপসর্গ ছিল না। স্ট্রোক বা হৃদ্রোগে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
শুক্রবার বাদ জুমা গাইবান্ধা শহরের রেলস্টেশন জামে মসজিদে আরিফের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে শহরের পৌর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। যে দিনে নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিল তার, সেই দিনেই চিরবিদায় জানাতে হলো প্রিয়জনদের। দুই পরিবারের সাজানো আয়োজন পরিণত হলো শোকের স্মৃতিতে।