বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সময় শনিবার ভোর ৫টার কিছু আগে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-ভৌতিক সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের মাত্র ১৫ কিলোমিটার গভীরে। সাধারণত ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল যত অগভীর হয়, ভূপৃষ্ঠে এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব তত বেশি হয়।
ভূমিকম্পের পর একই এলাকায় একাধিক শক্তিশালী আফটারশক অনুভূত হয়। এর মধ্যে একটি আফটারশকের মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ১।
ভূমিকম্পে বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাওমেরে বন্দরে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, টার্মিনাল ভবনের বড় বড় কংক্রিটের অংশ ভেঙে ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের ওপর পড়ে। এ সময় জাহাজে ওঠার গ্যাংওয়ে ধসে কয়েকজন সাগরে পড়ে যান।
পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশের গভর্নর এমানুয়েল মেলকিয়াদেস লাকা লেনা এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ধসে পড়া স্থাপনার নিচে চাপা পড়ে অনেকেই ঘুমের মধ্যেই মারা গেছেন।
সিক্কা জেলার তালিবুরা গ্রামের বাসিন্দা আর্নল্ড ওয়েলিয়ান্তো জানান, প্রবল কম্পনে তার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সন্তানের ঘরে ছুটে যান। তার ভাষ্য, এরই মধ্যে অনেক মানুষ পাহাড়ের দিকে ছুটে গিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, সাগরের পানি হঠাৎ সরে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পানি দীর্ঘ সময় স্বাভাবিকের তুলনায় নিচু অবস্থায় থাকায় সবাই আতঙ্কিত হয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যান। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও গিয়ে তিনি দেখেন, সেখানকার মানুষকে ইতোমধ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও প্রায় তিন ঘণ্টা পর তা প্রত্যাহার করা হয়। কারণ সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। তবে সতর্কতা জারির পর বহু মানুষ মোটরসাইকেলে করে উপকূলীয় এলাকা ছেড়ে ভেতরের দিকে চলে যান। বিএনপিবি জানিয়েছে, প্রায় ২ হাজার মানুষ নিজ উদ্যোগে নিরাপদ স্থানে সরে গেছেন।
দুর্যোগ সংস্থার তথ্যমতে, সিক্কা প্রদেশে তিনজন, মাংগারাই প্রদেশে ছয়জন এবং পূর্ব মাংগারাই প্রদেশে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া অন্তত দুজন গুরুতর এবং ১১ জন সামান্য আহত হয়েছেন।
তালিবুরার বাসিন্দা ওয়েলিয়ান্তো জানান, পরপর আফটারশক অনুভূত হওয়ায় অনেক মানুষ বাড়িতে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন। তারা খোলা জায়গায় রাত কাটাচ্ছেন।
রুতেং শহরের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ইউলিয়ান জুইতা একালিয়া বলেন, তিনি এত শক্তিশালী ভূমিকম্প জীবনে কখনো অনুভব করেননি। আরও কম্পনের আশঙ্কায় তিনি চুলা বাইরে নিয়ে রান্না করছেন। তার ভাষায়, ভূমিকম্পের সময় মনে হচ্ছিল তারা যেন ট্রাম্পোলিনের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন।
প্রত্যন্ত ও পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় ভূমিকম্পে মোট কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণে আরও সময় লাগবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক হিসাবে অন্তত ৫৪টি বাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া পাঁচটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, তিনটি উপাসনালয়, ছয়টি সরকারি ভবন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও একটি গুদাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিএনপিবি জানিয়েছে, মাংগারাই প্রদেশ ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। সংস্থাটি সবাইকে শান্ত থাকার পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বা ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা স্থাপনা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের জন্য ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। দেশটি তিনটি বড় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির কার্যক্রম দেখা যায়।
সূত্র: বিবিসি
বসির আহমেদ