‘স্বাধীনতা উপভোগ করুন ফ্রিডারের মধ্যে’ এই স্লোগান নিয়ে প্ল্যাটফর্মটি উদ্যোক্তাদের কাছে শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়; বরং বাংলাদেশিদের নিজেদের গল্প, সংবাদ, মতামত ও সৃজনশীলতা তুলে ধরার নিজস্ব ডিজিটাল ঠিকানা। তাদের লক্ষ্য ছিলো দেশীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, যেখানে ব্যবহারকারীর পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দেশের ভেতরে রাখা সম্ভব হবে।
ফ্রিডারের উদ্যোক্তা আখতারুজ্জামান জানান, দেশ-বিদেশের মানুষের মধ্যে প্ল্যাটফর্মটি নিয়ে ইতোমধ্যে আগ্রহ ও আস্থা তৈরি হয়েছে। অথচ উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা দিন দিন কমে আসছে। এক বছরে এক লাখ ব্যবহারকারী পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বাংলাভিশনে প্রতিবেদন প্রচারের পর প্রতিদিন প্রায় এক লাখ করে নতুন ব্যবহারকারী নিবন্ধন করছেন। এতে একদিকে যেমন সাফল্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি সার্ভারের সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় পুঁজি না থাকায় সার্ভারের সক্ষমতা বাড়ানো, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও নতুন বিনিয়োগ কোনোটিই প্রত্যাশিত গতিতে করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এত বিপুল সংখ্যক নতুন ব্যবহারকারীকে কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিজেদের মেধা, শ্রম ও স্বপ্ন দিয়ে একটি পর্যায়ে নিয়ে আসা প্ল্যাটফর্মটি এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে পড়েছে।
ফ্রিডারের হেড অব সাপোর্ট রেজাউল করিম বলেন, এটি শুধু রংপুরের উদ্যোগ নয়, বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের জন্যও সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলতে পারে। তবে ফেসবুকের মতো প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সহজ নয়। বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তি, উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের অর্জিত আস্থা রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের। ফ্রিডারকে টিকে থাকতে হলে ব্যবহারকারীর আস্থা ধরে রাখার পাশাপাশি নিয়মিত প্রযুক্তি উন্নয়ন, শক্তিশালী নিরাপত্তা, মানসম্মত কনটেন্ট এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, এত বড় চ্যালেঞ্জ ব্যক্তি উদ্যোগে মোকাবিলা করা কঠিন; প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ।
ফ্রিডারের মার্কেটিং প্রধান বাদশা আলম জানান, বাংলাভিশনে প্রতিবেদন প্রচারের পর তাদের মাঠপর্যায়ের মার্কেটিং কার্যক্রম অনেকটাই থেমে গেছে। কারণ, বর্তমানে প্রচারণার প্রয়োজন না থাকলেও সার্ভারের ধারণক্ষমতা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। নতুন ব্যবহারকারীর চাপ সামলাতে না পারার আশঙ্কায় মাঠপর্যায়ে টিম পাঠাতেও ভয় পাচ্ছেন তারা। অথচ কর্মীদের বসিয়ে রেখেও নিয়মিত বেতন দিতে হচ্ছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।
ফ্রিডারে মাত্র ১শ’৫০ টাকায় প্রোফাইল এবং ৩শ' টাকায় পেজ ভেরিফিকেশন সুবিধা, নামমাত্র খরচে পোস্ট প্রমোট ও বিজ্ঞাপনের সুবিধা এবং এক হাজার ফলোয়ার হলেই মনিটাইজেশনের সুযোগ রয়েছে বলে জানান উদ্যোক্তারা। কিন্তু সেই চাহিদা পূরণে এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থের সংকট।
একদিকে প্রতিদিন লাখো নতুন ব্যবহারকারী, অন্যদিকে সীমিত সার্ভার সক্ষমতা ও পুঁজির অভাব এই দুই বাস্তবতার টানাপোড়েনে ফ্রিডারের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত বিনিয়োগ না এলে ব্যবহারকারীদের এই আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হবে। আর্থিক সহযোগিতা না পেলে তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগটি মাঝপথেই থেমে যেতে পারে।
বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশীয় উদ্যোগকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। কারণ, দেশের মানুষের ডিজিটাল কর্মকাণ্ড, বিজ্ঞাপন ও অনলাইন লেনদেনের অর্থের একটি অংশ দেশীয় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, ফ্রিডারের মতো উদ্যোগগুলো সফল হলে তার সুফল দেশের প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
রংপুর থেকে শুরু হওয়া ফ্রিডার তাই এখন শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়; এটি দেশীয় প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা, স্বপ্ন ও সম্ভাবনারও পরীক্ষা। ব্যবহারকারীদের ব্যাপক সাড়া সেই সম্ভাবনার প্রমাণ দিলেও পুঁজির অভাব তৈরি করেছে বড় প্রশ্ন। সময়মতো বিনিয়োগ ও পৃষ্ঠপোষকতা মিললে এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশের প্রযুক্তির পরিচয় বহন করতে পারে। সময়মতো বিনিয়োগ ও পৃষ্ঠপোষকতা না এলে বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীর চাপ সামলে ফ্রিডারের সব সেবা একসঙ্গে সচল রাখা ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বসির আহমেদ