ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কৃষকেরা জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চলমান চরম আবহাওয়া তাদের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করছে। এরই মধ্যে ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, গ্রিস ও পর্তুগালের বহু কৃষিজমি খরা ও দাবানলের কবলে পড়েছে।
ফ্রান্সের সবজি উৎপাদকদের সংগঠন লেগুম দ্য ফ্রান্স জানিয়েছে, খরার কারণে সালাদ পাতা, গাজর, লিক, রসুন ও পেঁয়াজসহ হাজার হাজার টন সবজি নষ্ট হয়েছে। কিছু ফসলের উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে আসতে পারে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি ইউরো।
এদিকে ফ্রান্সের শ্যাম্পেন, বোর্দো ও বার্গান্ডির মতো বিখ্যাত আঙুর উৎপাদন অঞ্চলগুলোতেও তীব্র গরমের প্রভাব পড়েছে। ফলে আঙুরের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং এ বছর রেকর্ডের অন্যতম আগাম সময়েই আঙুর সংগ্রহ শুরু হতে পারে। উৎপাদন গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্পেনের কৃষি মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ মৌসুমে দেশটির শস্য উৎপাদন গত বছরের ২ কোটি ৪০ লাখ টন থেকে কমে প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ টনে নেমে আসতে পারে। এই হিসাব দাবানলের ক্ষতি যুক্ত করার আগেই করা হয়েছিল।
ইউরোপীয় কমিশনও সূর্যমুখী, ভুট্টা, আলু ও সয়াবিনসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন পূর্বাভাস কমিয়েছে। রান্নার তেলের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সূর্যমুখীর উৎপাদন ৭ শতাংশ, ভুট্টা ৬ শতাংশ এবং আলু ও সয়াবিনের উৎপাদন ৩ শতাংশ কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কৃষি সংগঠন আসাজা জানিয়েছে, দাবানলে ফলের বাগান, আঙুরক্ষেত, কৃষিজমি ও গ্রিনহাউস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি তীব্র তাপমাত্রা ও পানির সংকটে টমেটো ও ভুট্টার উৎপাদনও কমে গেছে।
অলিভ অয়েল উৎপাদকদের মতে, চরম তাপদাহ, খরা ও দাবানলের কারণে এ বছর অলিভ উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অলিভ অয়েলের দাম আবারও বাড়তে পারে।
এ গ্রীষ্মে গ্রিস, ইতালি ও পর্তুগালের অনেক অলিভ বাগান আগুনে পুড়ে গেছে। যেসব বাগান আগুন থেকে রক্ষা পেয়েছে, সেগুলোও ছাই, দূষিত বাতাস, অতিরিক্ত তাপ, রোগবালাই এবং কীটপতঙ্গের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ফলের আকার ছোট হয়ে যাচ্ছে এবং উৎপাদন কমছে।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বাজারে এক লিটার এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলের গড় দাম ৭ পাউন্ডের বেশি। দুই বছর আগের রেকর্ড মূল্য থেকে কিছুটা কমলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আবারও দাম বাড়তে শুরু করেছে।
সিটিজেনস অব সয়েল-এর প্রতিষ্ঠাতা সারা ভাশঁ বলেন, আবহাওয়া পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে শরৎ থেকেই অলিভ অয়েলের দাম আরও বাড়তে পারে। কারণ উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন ফল পাওয়া যাবে না।
অন্যদিকে অলিভ অয়েল ব্র্যান্ড ফিলিপ্পো বেরিও-র যুক্তরাজ্য শাখার প্রধান ওয়াল্টার জানরে বলেন, স্পেনে তাপমাত্রা তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকলেও দীর্ঘ খরার কারণে অলিভ গাছ ফল ঝরিয়ে দিচ্ছে। এতে আগামী মৌসুমে উৎপাদন ও বাজারমূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
খরার প্রভাব পড়েছে যুক্তরাজ্যের কৃষিতেও। দেশটির পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আইসবার্গ লেটুস ও ব্রকলির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা মেটাতে এখন স্পেনসহ অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি বাড়াতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্রিটিশ কৃষকেরা সম্ভাব্য উৎপাদন ঘাটতির আশঙ্কা করছেন।
খাদ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ইউরোস্টার কমোডিটিজ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জেসন বুল বলেন, বারবার তাপপ্রবাহের কারণে ইউরোপজুড়ে শীতকালীন ফসল দ্রুত পেকে যাচ্ছে। এতে শস্যের দানা পূর্ণতা পাওয়ার সময় কমে যাচ্ছে, যা ফলন, গুণগত মান এবং মোট উৎপাদন—সবকিছুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তবে এই সংকটের মধ্যেও তুরস্ক ও ইতালিকে কিছুটা ব্যতিক্রম হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে তুরস্কে রেকর্ড পরিমাণ শীতকালীন শস্য উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ইতালিতেও গমের উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে ইউরোপীয় কমিশনের পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র: গার্ডিয়ান
বসির আহমেদ