ট্রাম্পের এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। ঘোষণার পরপরই এর নৈতিকতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে নভেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে রিপাবলিকানদের উদ্বেগের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে।
উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘রিপাবলিকানরা জিতলে, আপনারাও আমাদের সঙ্গে জিতবেন এবং পাবেন ৫ হাজার ডলার।’
প্রায় দুই ঘণ্টার বক্তব্যে তিনি ভোটারদের এমনভাবে ভোট দিতে বলেন, যেন তিনিই নির্বাচনের প্রার্থী। তবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কম থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে থাকা অনেক রিপাবলিকান প্রার্থীই দুই দিনের এই সম্মেলন এড়িয়ে গেছেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের দেশের ওপর একটি পাগলাটে, অসুস্থ ছায়া নেমে এসেছে। আমরা আমেরিকায় কমিউনিজমকে পরাজিত করব।’
রিপাবলিকানরা আশা করছে, দলটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই মধ্যবর্তী নির্বাচন কনভেনশন তাদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে সহায়তা করবে। তবে বিভিন্ন জরিপে ট্রাম্পের অনুমোদনের হার প্রায় ৩৮ শতাংশে থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী এলাকায় লড়াই করা অনেক রিপাবলিকান প্রার্থী সম্মেলনে অংশ নেননি। এমনকি প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণও হারাতে পারে রিপাবলিকানরা—এমন পূর্বাভাস রয়েছে।
তারপরও ট্রাম্পের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, নভেম্বরের নির্বাচনে নিজের ভূমিকা নিয়ে তিনি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, সাধারণত হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণে থাকা দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে খারাপ ফল করে। তবে এবার সেই পরিস্থিতি বদলাতে হবে।
ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, রিপাবলিকানরা হেরে গেলে সীমান্ত, কর ছাড়, নিরাপত্তা ও সম্পদ—সবই হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। তাঁর ভাষায়, দেশ ‘জাহান্নামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে’ এবং ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
সম্মেলনের প্রস্তুতিতেও কিছুটা বিশৃঙ্খলার ছাপ দেখা যায়। প্রথমে দ্বিতীয় রাতে ট্রাম্পের বক্তব্য দেওয়ার কথা থাকলেও পরে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি তাঁর বক্তব্যের সময়সূচি পরিবর্তন করে। বুধবার মূল বক্তব্য দেওয়ার পর বৃহস্পতিবার আবার সমাপনী বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
বক্তব্যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রসঙ্গও একাধিকবার টানেন ট্রাম্প। তেহরানকে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘বাড়াবাড়ি’ করলে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘খুব কঠোরভাবে’ আঘাত করতে হবে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হওয়ার বিষয়টিও স্বীকার করেন তিনি।
সম্মেলনস্থলেও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রত্যাশিত উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি। দুই বছর আগে মিলওয়াকিতে অনুষ্ঠিত চার দিনের প্রচলিত সম্মেলনের তুলনায় এবার প্রথম দিনের পরিবেশ ছিল অনেকটাই নিষ্প্রভ। দীর্ঘ লাইন বা খাবার ও টয়লেটের জন্য অপেক্ষার দৃশ্য ছিল না। ট্রাম্পের বক্তব্যের সময়ও অনেক আসন খালি দেখা যায়।
তবে ট্রাম্প দাবি করেন, অনুষ্ঠানস্থল পুরোপুরি ভর্তি ছিল এবং বাইরে সমসংখ্যক মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন। গার্ডিয়ানের সাংবাদিকরা বাইরে এমন কোনো দৃশ্য দেখতে পাননি।
সম্মেলনে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে আক্রমণও ছিল ট্রাম্পের বক্তব্যের বড় অংশজুড়ে। টেক্সাসে সিনেট প্রার্থী কেন প্যাক্সটন, উত্তর ক্যারোলাইনার সাবেক রিপাবলিকান গভর্নর রয় কুপার এবং মিশিগানের ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদসহ বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীকে আক্রমণ করেন তিনি।
ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির চেয়ারম্যান কেন মার্টিন রিপাবলিকানদের এই সম্মেলনকে প্রেসিডেন্টের ‘ভঙ্গুর অহংকার’ তুষ্ট করার একটি ‘অদ্ভুত প্রদর্শনী’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর দাবি, ট্রাম্প একজন ব্যর্থ ‘লেম ডাক’ প্রেসিডেন্ট এবং তিনি নিজের দলকেও পরাজয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।
দুই রাতব্যাপী এই অস্বাভাবিক সম্মেলনে মোট ১২ ঘণ্টার কর্মসূচি রয়েছে। বুধবারের বক্তাদের মধ্যে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বিভিন্ন নির্বাচনী প্রার্থী ছিলেন। তবে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি বিনোদন ও প্রদর্শনও ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ।
ফ্লোরিডার গভর্নর পদপ্রার্থী বায়রন ডোনাল্ডস এবং ট্রাম্প প্রশাসনের দুই মন্ত্রী মেহমেত ওজ ও স্কট বেসেন্ট বক্তব্য দেন। ট্রাম্পের UFC-প্রেমের কারণে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন দুই মিশ্র মার্শাল আর্ট যোদ্ধা—মিডলওয়েট বো নিকাল ও লাইটওয়েট জাস্টিন ‘দ্য হাইলাইট’ গেইথজি।
বেশির ভাগ বক্তাকে বক্তব্যের জন্য মাত্র পাঁচ মিনিট সময় দেওয়া হলেও নিকাল ও গেইথজি পেয়েছেন ১০ মিনিট করে। গেইথজি ভোটারদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আগের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতোই উৎসাহ নিয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
এর আগে রিপাবলিকানরা জানিয়েছিল, সম্মেলনের মূল লক্ষ্য হবে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, সীমান্ত সুরক্ষিত করা, জননিরাপত্তা বাড়ানো এবং মার্কিন কর্মী ও পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কিন্তু বক্তাদের বক্তব্যে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতে আক্রমণই বেশি গুরুত্ব পায়।
বৃহস্পতিবার আবারও বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। তবে তিনি জানিয়েছেন, এবার তাঁর বক্তব্য বুধবারের তুলনায় অনেক সংক্ষিপ্ত হবে। বক্তব্যের শেষ দিকে ভোটারদের উদ্দেশে তিনি আবারও বলেন, ‘দয়া করে ধরে নিন, আমিই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি।’
সূত্র: গার্ডিয়ান
বসির আহমেদ