ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারবেষ্টিত সীমান্ত জেলা কুড়িগ্রামে ছোট-বড় চার শতাধিক চরে বাস করে প্রায় ৫ লাখ মানুষ। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বিপরীতে চরে প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে মাত্র ২৪২টি। ফলে অসংখ্য দ্বীপচরের শিশুরা মৌলিক শিক্ষার সুযোগই পাচ্ছে না। সামান্য কিছু শিশু দূরবর্তী চরের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেলেও মে থেকে সেপ্টেম্বর—এই পাঁচ মাস ঝড়, বৃষ্টি আর বন্যার কারণে পড়ালেখা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। শুকনো মৌসুমে মাইলের পর মাইল তপ্ত বালুপথ হেঁটে যাওয়া যেমন কষ্টকর, তেমনি নদীপথে নৌকার সংকট ও যাতায়াতের খরচ চালানো এসব পরিবারের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
গত রোববার কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন যাত্রাপুর ইউনিয়নের চারটি দুর্গম চরে সরেজমিন ঘুরে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত শিশুদের এই করুণ চিত্র দেখা যায়। যাত্রাপুর নৌঘাট থেকে শ্যালো নৌকায় প্রায় এক ঘণ্টার পথ পেরিয়ে পশ্চিম ঝুনকার চর। প্রায় ১৬ বছর আগে গড়ে ওঠা এই চরে বর্তমানে প্রায় একশ পরিবার বসবাস করছে।
চরের অধিবাসী বাণিজ উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, ‘মেয়ে আমেনার বয়স সাত বছর পার হয়ে গেল, অথচ চরে স্কুল না থাকায় তাকে ভর্তি করাতে পারিনি।’ ৪ কিলোমিটার দূরে চিড়াখাওয়ার চরে একটি স্কুল থাকলেও খেয়া নৌকা না থাকায় সেখানে সন্তানদের পাঠানো সম্ভব হয় না বলে জানান সুমাইয়ার বাবা বানছার আলী। চরের বাসিন্দা মফিজুল ইসলাম জানান, উপায় না পেয়ে অনেকে বাধ্য হয়ে সন্তানদের নূরানী মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছেন।
ঝুনকার চর থেকে নৌকায় আরও এক ঘণ্টার পথ দক্ষিণ কালিরআলগা চর। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে এখানে নতুন করে বসতি গড়েছে প্রায় ৪০০ পরিবার। কিন্তু এই চরেও কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। চরের বাসিন্দা ফিরোজা বেগম জানান, তিন বছর আগে নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে এই চরে উঠেছেন। তার ৯ বছরের ছেলে ফিরোজের পড়ালেখা বন্ধ। সারাদিন কাজহীন ভবঘুরের মতো ঘুরে কেটে যায় তার সময়।
চরের রাস্তায় কথা হয় রুহুল আমিন, শফিকুল ও শাকিলের মতো কয়েকজন কিশোরের সঙ্গে। দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর চরে আসার পর তাদের পড়াশোনা থেমে গেছে। তারা এখন শুধু বয়স একটু বাড়ার অপেক্ষায় আছে, যাতে ঢাকায় গিয়ে রডমিস্ত্রির কাজ নিতে পারে।
শিক্ষার আলো না থাকায় চরের কিশোররা যেমন অকালেই শিশুশ্রমে যুক্ত হয়ে এলাকা ছাড়ছে, তেমনি কন্যাশিশুরা বলি হচ্ছে বাল্যবিয়ের। নদী পারাপারের ঝুঁকি, অর্থকষ্ট ও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ১২-১৩ বছর হতেই অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বসতে হচ্ছে বিয়ের পিঁড়িতে।
স্থানীয় যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর জানান, তাঁর ইউনিয়নের চারটি জনবসতিপূর্ণ চরে প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় শত শত শিশু মৌলিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার আকুতি জানিয়েও কোনো সুরাহা হয়নি।’
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার রায় চৌধুরী বলেন, ‘চরে প্রতিনিয়ত ভাঙা-গড়ার খেলা চলে। তবে যেসব চর স্থায়ী রূপ নিয়েছে এবং বিদ্যালয় নেই, সেগুলোতে স্কুল স্থাপনের বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত ও বরাদ্দ পাওয়া গেলেই নতুন স্কুল স্থাপনের কার্যক্রম শুরু করা হবে।’
তবে সরকারি পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নের এই দীর্ঘসূত্রতার মাঝে চরের সুমাইয়া-আমেনাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারেই ঢাকা পড়ছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ব্রহ্মপুত্রের চরে হারিয়ে যাবে আরও একটি প্রজন্মের রঙিন শৈশব।
বসির আহমেদ