নেপাল ও তিব্বতে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গ্লোবাল কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান সিস্টেমিকের প্রতিবেদনটি ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করা হয়েছে। এতে কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) এবং জিবি প্যান্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান এনভায়রনমেন্ট।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিমালয়-কারাকোরাম অঞ্চলে আনুমানিক ৪০ হাজার হিমবাহ রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ২১টি হিমবাহ নিয়মিত ও বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল পাহাড়ি পরিবেশের তুলনায় এই পর্যবেক্ষণব্যবস্থা অত্যন্ত অপ্রতুল বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
হিমবাহ গলে পিছিয়ে যাওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে পাথর ও বরফের অস্থিতিশীল বাঁধের পেছনে নতুন হ্রদ তৈরি হয়। এসব হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে গেলে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘদিন জমাট থাকা পারমাফ্রস্ট বা মাটি এবং উঁচু পাহাড়ি ঢালও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। এতে একের পর এক বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা বাড়ছে। ভারতের মোট ভূমির প্রায় ১৮ শতাংশ হিমালয় অঞ্চলে অবস্থিত। অথচ দেশটির মোট দুর্যোগের প্রায় ৩৫ শতাংশই এই অঞ্চলে ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত সরকার গত জুলাইয়ে সংসদে জানিয়েছিল, ২০২৫ সালের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের পর ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলের ১৮৯টি উচ্চঝুঁকির হিমবাহ-হ্রদের মধ্যে ৫৬টিকে ‘অত্যন্ত উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশটির হিমালয়সংলগ্ন নদী অববাহিকায় ১০ হেক্টরের বেশি আয়তনের ২ হাজার ৪৮৫টি হিমবাহ-হ্রদ পর্যবেক্ষণ করছে কেন্দ্রীয় পানি কমিশন। এরই মধ্যে হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে ভয়াবহ বন্যার উদাহরণও রয়েছে। ২০২৩ সালে সিকিমে হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যায় অন্তত ৭০ জন নিহত হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এর আগে ২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডে একই ধরনের দুর্যোগে ২০০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারান।
তবে হিমালয়ের ঝুঁকি শুধু আকস্মিক বন্যাতেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর পানির অন্যতম প্রধান উৎস এই পর্বতমালা। আইসিআইএমওডির মতে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের অধিকাংশ নদী অববাহিকায় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ‘পিক ওয়াটার’ বা পানিপ্রবাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এরপর হিমবাহের ভর কমতে থাকায় নদীতে হিমবাহনির্ভর পানির প্রবাহও কমে যেতে পারে।
গবেষণায় ভারতের অর্থনীতিতে হিমালয়ের পানির গুরুত্বের একটি বড় চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, হিমালয়ের পানি ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২০ শতাংশের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। গম, ধান, চা, জলবিদ্যুৎ এবং তীর্থভিত্তিক পর্যটনসহ বিভিন্ন খাত এই পানির ওপর নির্ভরশীল। অথচ হিমালয়সংলগ্ন রাজ্যগুলো সেই অর্থনৈতিক মূল্যের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ ধরে রাখতে পারে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের গ্রান্থাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ লর্ড নিকোলাস স্টার্ন হিমালয়কে ‘তৃতীয় মেরু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, আর্কটিক বা অ্যান্টার্কটিকার বিপরীতে এই অঞ্চলের নিচে বসবাস করছে শত শত কোটি মানুষ। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই পরিবেশগত ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বা ‘টিপিং পয়েন্টের’ দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
তবে হিমবাহ গলে যাওয়ার সব কারণই নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। সিস্টেমিকের গবেষণা বলছে, হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়ার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী ব্ল্যাক কার্বন বা কালো কার্বন। সমতল অঞ্চলের ইটভাটাসহ বিভিন্ন উৎস থেকে নির্গত এই কালো ধোঁয়া বরফ ও তুষারের ওপর জমে সূর্যের আলো বেশি শোষণ করে এবং গলনপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে।
গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের তুলনায় ব্ল্যাক কার্বন নিয়ন্ত্রণ এমন একটি ক্ষেত্রে, যেখানে ভারত ও প্রতিবেশী দেশগুলো সরাসরি পদক্ষেপ নিতে পারে। প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ও সিস্টেমিকের জ্যেষ্ঠ পরিচালক আরুশি চোপড়া বলেন, হিমালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ টিপিং পয়েন্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং এর সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা ঝুঁকিতে রয়েছে।
গবেষণায় হিমালয় রক্ষায় ১০টি অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্ল্যাক কার্বন নিঃসরণ কমানো, হিমবাহ পর্যবেক্ষণ বাড়ানো, দুর্যোগের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং পাহাড়ি পর্যটনের ধরন পরিবর্তন করা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় হিমালয় অঞ্চলে বছরে প্রায় ৪০ কোটি পর্যটক ভ্রমণ করেন। গবেষকেরা মনে করছেন, শুধু পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর পরিবর্তে স্থানীয় অর্থনীতিতে পর্যটনের আয় ধরে রাখা এবং তা স্থানীয় উন্নয়নে পুনর্বিনিয়োগের দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আইসিআইএমওডির মহাপরিচালক পেমা গিয়ামৎসো বলেন, হিমবাহ সরে যাচ্ছে, পারমাফ্রস্ট ও উঁচু পাহাড়ি ঢাল ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে এবং এর ফলে নিচের জনপদ ও অবকাঠামোতে জটিল ও ধারাবাহিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, এসব ঝুঁকি কোনো দেশের সীমান্ত মানে না। তাই হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে যৌথভাবে পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকির তথ্য বিনিময়, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় বিনিয়োগ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।
সূত্র: বিবিসি
বসির আহমেদ