ঢাকা | বঙ্গাব্দ

পুঁজিবাদকেও বদলে দেবে এআই, কিন্তু কীভাবে?

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 14, 2026 ইং
পুঁজিবাদকেও বদলে দেবে এআই, কিন্তু কীভাবে? ছবির ক্যাপশন:
ad728

স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম চিন্তাশীল যন্ত্র একদিন সম্পত্তি, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ও বৈষম্যকে ধ্বংস করতে পারে—এমন ধারণা পশ্চিমা রাজনৈতিক চিন্তায় বহু পুরোনো। দার্শনিক অ্যারিস্টটল তার ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থে এমন এক কল্পনার কথা উল্লেখ করেছিলেন, যেখানে যন্ত্র মানুষের নির্দেশ ছাড়াই নিজের কাজ করতে শুরু করে। তার যুক্তি ছিল, যদি সব যন্ত্র নিজে থেকেই নিজেদের কাজ করতে পারে, তাহলে কারিগরের সহকারী কিংবা মনিবের দাসের প্রয়োজন থাকবে না।

স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি একদিন শ্রেণিহীন সমাজের সূচনা করতে পারে—এমন ধারণা পাওয়া যায় কার্ল মার্ক্সের লেখাতেও। ১৮৫৮ সালে তিনি এমন এক ভবিষ্যতের কথা কল্পনা করেছিলেন, যেখানে ব্যক্তিমালিকানাধীন জ্ঞান ‘সামাজিক জ্ঞান’-এ পরিণত হবে এবং তা একটি ‘সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি’ বা ‘জেনারেল ইন্টেলেক্ট’-এ রূপ নেবে। তার মতে, এমন পরিবর্তন পুঁজিবাদের প্রচলিত ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিতে পারে।

আজ সেই সম্ভাবনাই সিলিকন ভ্যালির একাংশকে ভাবিয়ে তুলছে। জুলাইয়ে ওপেনএআইয়ের স্ট্র্যাটেজিক ফিউচার বিভাগের প্রধান ডিন বল দাবি করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপেন সোর্স মডেল নিয়ে চীনের নীতি একসময় ‘পূর্ণাঙ্গ এআই কমিউনিজম’-এর দিকে নিয়ে যেতে পারে।

ডিন বলের অভিযোগ, চীনে এআইকে একটি জনকল্যাণমূলক সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের মাধ্যমে ‘ডিজিটাল জনপরিকাঠামো’ হিসেবে সরবরাহ করা হতে পারে। তিনি এটিকে ‘ডিস্টোপিয়ান হেলস্কেপ’ বা ভয়াবহ ভবিষ্যৎ হিসেবে আখ্যা দেন। তবে চীনের কিমি, কিউয়েন ও ডিপসিকের মতো মডেলের উত্থান যে পুঁজিবাদের অবসানের সংকেত—এমনটা মনে করেন না লেখক। তাঁর মতে, এটি বরং বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তারের একটি কৌশলের মোকাবিলায় আরেকটি কৌশল।

যুক্তরাষ্ট্রের এআই কৌশল হলো বিপুল কম্পিউটিং সক্ষমতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যবহারকারীদের ইন্টারনেটের মাধ্যমে এআই ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মানুষকে মার্কিন সফটওয়্যার, ক্লাউড কম্পিউটিং সেবা ও নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল করার সুযোগ তৈরি হয়। এর বিপরীতে চীন ওপেন সোর্স এআই মডেলের ওপর জোর দিচ্ছে। এতে ব্যবহারকারীরা নিজেদের সার্ভারে এআই চালাতে পারবেন এবং চীনা কোনো এআই সরবরাহকারীর মাধ্যমে নিজেদের তথ্য ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকিও কমবে।

চীনের ধারণা, এআই যদি সত্যিই একটি ‘সর্বজনীন প্রযুক্তি’ বা ‘জেনারেল পারপাস টেকনোলজি’ হয়ে ওঠে, তাহলে এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তিগুলোর নেতৃত্ব দখল করা সম্ভব হবে। এর মধ্যে থাকতে পারে মস্তিষ্ক-কম্পিউটার সংযোগ, জৈবপ্রযুক্তি এবং ড্রোনভিত্তিক ‘লো-অল্টিটিউড ইকোনমি’।

এই প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র নাকি চীন—কে এগিয়ে যাবে, তা আগামী শতাব্দীর তথ্যপ্রযুক্তির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এর বাইরে আরেকটি পথও থাকতে পারে—এমন প্রশ্ন তুলেছেন লেখক। দুটি ভিন্ন ধরনের শ্রেণিবিন্যাস ও বৈষম্যনির্ভর তথ্য-পুঁজিবাদের প্রতিযোগিতার পরিবর্তে এআইকে যদি মানবিক প্রয়োজন পূরণের দিকে পরিচালিত করা যায়, তাহলে কী হবে?

বড় ভাষা মডেল বা এলএলএমগুলো ইতোমধ্যেই মার্ক্সের বর্ণিত ‘জেনারেল ইন্টেলেক্ট’-এর কিছু বৈশিষ্ট্য দেখাচ্ছে। মানুষের তৈরি বিপুল জ্ঞান ও তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত এসব মডেল এমন কাজ করতে সক্ষম হচ্ছে, যা প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ অনেক জ্ঞানভিত্তিক কর্মীর কাজের মানকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এআই ইতোমধ্যে বিভিন্ন কাজ এবং কিছু ক্ষেত্রে পুরো চাকরির দায়িত্বই বিলুপ্ত করার পথে এগোচ্ছে। কিন্তু এর ফলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা এখনো অনেকেই পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি।

বর্তমানে এআই কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া বাজার অবস্থান তাদের শেয়ারহোল্ডার ও কর্মীদের বিপুল অর্থ এনে দিচ্ছে। কিন্তু চাকরি ধ্বংসের ক্ষমতার কারণে এআই আগের প্রায় সব প্রযুক্তিগত বিপ্লবের চেয়ে আলাদা। অতীতে একটি ধরনের চাকরি বিলুপ্ত হলে নতুন ধরনের কাজ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এবার ধ্বংস হওয়া চাকরিগুলো একইভাবে নতুন কাজ দিয়ে প্রতিস্থাপিত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। হুমকির মুখে শুধু শ্রমিকদের চাকরি নয়, পুঁজিপতিদের ভূমিকাও। কোনো মেশিন যদি জুনিয়র আইনজীবী বা ওয়েব ডিজাইনারের কাজ করতে পারে, তাহলে উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক কিংবা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবসায়ীর কাজও করতে পারবে।

অর্থনীতিবিদ ফিলিপ আগিয়োঁর মতে, এআই উদ্যোক্তার দক্ষতাকে স্বয়ংক্রিয় করার পাশাপাশি উদ্ভাবন ও মুনাফার মধ্যকার সম্পর্কও ভেঙে দিতে পারে। কারণ কোনো নতুন আবিষ্কারের নকশা যদি একটি মেশিন তাৎক্ষণিকভাবে অনুকরণ করে আরও উন্নত করে ফেলতে পারে, তাহলে সেই আবিষ্কারের পেটেন্ট নেওয়ার প্রয়োজনই বা থাকবে কেন? এ অবস্থায় সামনে দুটি পথ—সামাজিক ন্যায়ের স্বার্থে এআই গ্রহণের গতি ধীর করা ও বাধাগ্রস্ত করা, অথবা এআইকে ভিন্ন একটি কাঠামোর মধ্যে গ্রহণ করা। লেখকের পছন্দ দ্বিতীয় পথটি।

কার্ল মার্ক্স উনিশ শতকের শিল্পায়নকে এমন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছিলেন, যেখানে মানুষ উৎপাদন প্রক্রিয়ার কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে সরে গিয়ে যন্ত্র পরিচালনার তদারকিতে পরিণত হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একই ধরনের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে মেধাভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে। আর এলএলএম চালুর পাঁচ বছরও পূর্ণ হওয়ার আগেই এর প্রভাব বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব গভীর হতে পারে। কারণ মানব শ্রমিক, উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তাকে বাদ দিয়ে পরিচালিত পুঁজিবাদ বর্তমানের পুঁজিবাদের মতো থাকবে না।

তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—ব্রিটেন কীভাবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে নিজেদের সার্বভৌম এআই তৈরি করবে। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, মানবতার প্রয়োজন পূরণের জন্য এআইকে কীভাবে গড়ে তোলা যায়। এর কিছু সম্ভাব্য পথও রয়েছে। কাজ ও মজুরির সম্পর্ককে দুর্বল করে সর্বজনীন মৌলিক সেবা ও আয় নিশ্চিত করা, সমবায় ও অলাভজনক ব্যবসায়িক কাঠামোকে উৎসাহিত করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে বাজারের পরিবর্তে সম্পদ বণ্টনের আরও যৌক্তিক ব্যবস্থা তৈরি করা যায়।

লেখকের মতে, মার্কিন এআই ব্যবস্থা অনেকটা আগ্রাসী, গোপনীয়তা-নির্ভর, মুনাফাকেন্দ্রিক ও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে, কারণ এটি একটি নির্দিষ্ট সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। একইভাবে চীনের মডেলগুলো তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত হলেও সেগুলো দেশটির বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যকে এগিয়ে নিতে তৈরি হচ্ছে। সবুজ, সামাজিক-গণতান্ত্রিক, সমবায়ভিত্তিক কিংবা এমনকি নৈরাজ্যবাদী ভবিষ্যৎ যারা কল্পনা করেন, তারা চাইলে এখন থেকেই প্রযুক্তির বিকাশের গতিপথ নিজেদের লক্ষ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারেন।

লেখকের প্রস্তাব, প্রয়োজনে বর্তমানের শীর্ষ এআই মডেলের চেয়ে ছয় মাস পিছিয়ে থেকেও সেই মডেলগুলো ব্যবহার করে এমন একটি এআই তৈরি করা সম্ভব, যার মালিকানা কারও হাতে থাকবে না এবং যার মূল ভিত্তিতে থাকবে মানবিকতা ও সার্বজনীন মূল্যবোধ। চীনের ওপেন সোর্স মডেল যদি সিলিকন ভ্যালির বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজার দখলে প্রভাব ফেলতে পারে, তাহলে একইভাবে একটি উন্মুক্ত ও বিনামূল্যের মানবিক এআইও বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যখন বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মডেল ব্যবহারে মাসিক সাবস্ক্রিপশন প্রয়োজন হয়।

একটি সবুজ ও সামাজিক-গণতান্ত্রিক এআই মডেল বর্তমান মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের ‘নৈতিক’ মডেলগুলোর চেয়েও ভিন্ন হতে পারে। এতে কম শক্তি ও কম কম্পিউটিং সক্ষমতা ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রতিযোগিতা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বদলে এতে পরোপকারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। এর কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে ব্যক্তি নয়, বরং সম্প্রদায়।

তবে এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্রেণিহীন সমাজ তৈরি করবে—এমনটা বলা যায় না। কিন্তু এটি বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোর সামনে একটি বড় ধরনের সংকট তৈরি করার সম্ভাবনা রাখে। আর সেই সংকটের মধ্যেই অতীতকে আঁকড়ে থাকার বদলে ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে সক্ষম মানুষদের জন্য নতুন সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সূত্র: গার্ডিয়ান


নিউজটি পোস্ট করেছেন : বসির আহমেদ

কমেন্ট বক্স
একটি ক্ষেপণাস্ত্রও ঠেকাতে পারেনি কিয়েভ: ১৭ প্রাণহানি, মিত্রদ

একটি ক্ষেপণাস্ত্রও ঠেকাতে পারেনি কিয়েভ: ১৭ প্রাণহানি, মিত্রদ