ঢাকা | বঙ্গাব্দ

চাকরির পরীক্ষা থেকে মোদি সরকারের গদি: ককরোচ জনতা পার্টির উত্থান যেভাবে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 3, 2026 ইং
চাকরির পরীক্ষা থেকে মোদি সরকারের গদি: ককরোচ জনতা পার্টির উত্থান যেভাবে ছবির ক্যাপশন:
ad728

২৫ বছর বয়সী অশোক কুমার বিশ্বাস করেন, মোদি একসময় তার পরিবারের জীবন বদলে দিয়েছিলেন। কৃষক বাবা-মায়ের সংসারে স্বল্পমূল্যের রান্নার গ্যাস, কৃষি ভর্তুকিসহ বিভিন্ন সরকারি সুবিধা কিছুটা স্বস্তি এনে দেয়। সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই তার বাবা-মা টানা তিনটি নির্বাচনে মোদিকে ভোট দেন।

কিন্তু গত সপ্তাহে সেই অশোককেই দেখা গেছে নয়াদিল্লির জনতার মান্তারে মোদিবিরোধী বিক্ষোভে। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’, যা বর্তমানে ক্ষুব্ধ ও হতাশ ভারতীয় তরুণদের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় জাতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায়। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষার ফল বাতিল করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন অশোকের ছোট ভাই অভিষেকও।

ভারতে এসব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা শুধু একটি শিক্ষাগত ধাপ নয়, বরং মধ্যবিত্ত জীবনে প্রবেশের অন্যতম প্রধান সোপান। কূটনীতিক, প্রশাসক, কেরানি, বন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে হাজারো সরকারি পদে নিয়োগ হয় এসব পরীক্ষার মাধ্যমে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা পরিসংখ্যানগতভাবে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার চেয়েও কঠিন। তবে সফল হলে মেলে আজীবনের চাকরির নিরাপত্তা, পেনশন ও আবাসন সুবিধা- যা বেসরকারি খাতে প্রায় অনুপস্থিত।

অন্যদিকে মার্সেলাস ইনভেস্টমেন্ট মানেজারর্স-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের আগের দশকে করপোরেট খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ছিল বছরে প্রায় ১১ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ শতাংশে।

রয়টার্সের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৪ সালের পর অন্তত দুই ডজন জাতীয় পরীক্ষার ফল প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে বাতিল হয়েছে। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।

দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার তরুণ রাস্তায় নেমে আসেন। তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে সরকারি চাকরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথটিই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

চার বছর আগে বিহারের বাড়ি ছেড়ে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরের দিল্লিতে আসেন অশোক। স্নাতকোত্তর শেষ করে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে কোচিংয়ে ভর্তি হন। একাধিকবার চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাননি।

পরে ছোট ভাই অভিষেকও মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য দিল্লিতে যোগ দেন। কিন্তু প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় তার স্বপ্নও অনিশ্চয়তায় পড়ে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ দ্রুত বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। এতে যোগ দেন হাজার হাজার বেকার ও হতাশ তরুণ।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৩০ বছরের কম বয়সী ভারতীয়দের বেকার হওয়ার সম্ভাবনা দেশের গড় নাগরিকের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তার মন্ত্রীদের ব্যঙ্গ করে পোস্টার বহন করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন মোদিকে ঘিরে গড়ে ওঠা ‘অজেয়’ ভাবমূর্তিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

যদিও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। এর আগে সরকার দাবি করেছিল, বেকারত্ব সংকট নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে, তা অতিরঞ্জিত এবং ভারতের সামষ্টিক অর্থনীতি এখনো শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামটি এসেছে ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্য থেকে। বেকার তরুণদের প্রসঙ্গে ‘তেলাপোকা’ শব্দ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। পরে তিনি দাবি করেন, তার বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।

গত ২০ জুলাই প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সংসদ অভিমুখে মিছিল করার চেষ্টা করেন বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। পুলিশ বাধা দিলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

অশোক বলেন, “ধর্ম, জাতপাত ও ভাষা মানুষকে সাধারণত বিভক্ত করে রাখে। কিন্তু শিক্ষার প্রশ্নে এই প্রথম সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে।” তিনি দাবি করেন, পুলিশের লাঠিচার্জে তিনিও আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, তারা পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে এবং সংঘর্ষে ১১৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

টানা আন্দোলনের পর বিক্ষোভকারীরা বড় ধরনের সাফল্য পান। আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন।

এরপর মোদি সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কঠোর আইন করার ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে একটি বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

সরকার আরও ঘোষণা দিয়েছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে এবং আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করা হবে।

ভারতের অর্থনৈতিক উত্থানের সুফল এখনো পুরোপুরি পৌঁছায়নি বিহারের মতো দরিদ্র রাজ্যে। অশোক ও অভিষেকের বাড়িতে গিয়ে রয়টার্সের সাংবাদিকরা দেখেছেন, ছোট্ট উঠানে গোবরের স্তূপের পাশে বাঁধা একটি মহিষ। সেই মহিষের দুধ বিক্রি করেন তাদের মা, আর বাবা সামান্য ধান চাষ করে সংসার চালান।

২০ বছর বয়সী অভিষেক তিনবার মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। সর্বশেষ পরীক্ষার ফল বাতিল হওয়ায় তার সব পরিশ্রম মুহূর্তেই অর্থহীন হয়ে যায়। তিনি বলেন, “আমি ডাক্তার হয়ে মায়ের জন্য গয়না কিনতে চেয়েছিলাম। বাড়িতে একটি টেলিভিশন দিতে চেয়েছিলাম।”

এখন নতুন একজোড়া স্যান্ডেল কেনার টাকাও বাবা-মায়ের কাছে চাইতে সংকোচ বোধ করেন তিনি। তার কণ্ঠে হতাশা, “আর কত পড়ব? এত বড় প্রস্তুতি আবার নেওয়া সম্ভব নয়।”

কৈশোর থেকেই সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখতেন অশোক। বিদ্যুৎ চলে গেলে লণ্ঠনের আলোয় পড়াশোনা করেছেন। বিশ্বাস ছিল, কঠোর পরিশ্রমই সাফল্য এনে দেবে। কিন্তু একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস ও দুর্নীতির ঘটনায় সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়।

গত চার বছরে তিনি সাতটি বড় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছেন। এই প্রস্তুতির পেছনে তার পরিবার প্রায় ১০ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে, যা প্রায় পুরোটাই বাবার আজীবনের সঞ্চয়।

দিল্লির ছোট্ট ভাড়া করা কক্ষের দেয়ালে এখনো ঝুলছে স্বামী বিবেকানন্দের বিখ্যাত উক্তি— “উঠো, জাগো, লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত থেমো না।”

কিন্তু সেই বাক্য আজ আর তাকে অনুপ্রাণিত করে না। অশোকের ভাষায়, “ভারতের সরকারি পরীক্ষা ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে।”

৪১ বছর বয়সী চলচ্চিত্র নির্মাতা দিব্যা উন্নি ভারতের সফল ব্যক্তিদের একজন। ভগ ম্যাগাজিনে কাজ করার পর অভিনয় ও চলচ্চিত্র পরিচালনায় সফলতা পেয়েছেন তিনি।

তবুও জুলাই মাসে তিনি হাজারো ক্ষুব্ধ তরুণের সঙ্গে দিল্লির জনতার মান্তারে বিক্ষোভে যোগ দেন। বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন—“ইনকিলাব জিন্দাবাদ”, আর লাউডস্পিকারে বাজতে থাকে মাইকেল জ্যাকসনের প্রতিবাদী গান They Don't Care About Us।

দিব্যা বলেন, “আমরা শুধু এই দেশের শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম।”

দিব্যার গৃহকর্মী মমতা সিং বিহার থেকে মুম্বাইয়ে এসেছিলেন মেয়ের ভবিষ্যতের আশায়। গৃহকর্মীর কাজ করে তিনি বছরে প্রায় ৩ হাজার ডলার ব্যয় করতেন মেয়ে সিমরনের কোচিংয়ের জন্য।

পরে সরকার পরীক্ষার ফল বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেয়। কিন্তু দ্বিতীয় পরীক্ষায় প্রত্যাশার চেয়ে কম নম্বর পাওয়ার পর সিমরন চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে অন্য বিষয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

মা মমতা সিংয়ের কণ্ঠে তখন শুধু একটাই প্রশ্ন- “আজ আমার মেয়ের বয়স ২১। এক বছর পর হবে ২২। আবার যদি একই ঘটনা ঘটে? আমরা কি সারাজীবন এভাবেই চলতে থাকব? আমার মেয়ে নিজের জীবনটা কবে বাঁচবে?”

সূত্র: রয়টার্স


নিউজটি পোস্ট করেছেন : বসির আহমেদ

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
এমপিদের জন্যে এবার সংসদ সচিবালয়ের ভিন্ন উদ্যোগ  

এমপিদের জন্যে এবার সংসদ সচিবালয়ের ভিন্ন উদ্যোগ