সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও পেয়েছেন ৫ কোটি ৬১ লাখের বেশি ভোট। অন্যদিকে লুলার ভোটের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৩৯ লাখ।
প্রথম দফায় ফ্লাভিওর এই ফল ব্রাজিলের ডানপন্থী রাজনীতির শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্য ডানপন্থী প্রার্থীদের ভোট দ্বিতীয় দফায় তার পক্ষে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে রোনালদো কাইয়াদো পেয়েছেন ২.১ শতাংশ এবং রেনান সান্তোস পেয়েছেন ২.২ শতাংশ ভোট।
এবারের নির্বাচনে বলসোনারোপন্থী রাজনীতিকদেরও উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে কার্লোস বলসোনারো ও তার স্ত্রী মিশেল বলসোনারো সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। আরেক ছেলে জাইর রেনান নির্বাচিত হয়েছেন নিম্নকক্ষের সদস্য। জাইর বলসোনারোর সাবেক অবকাঠামোমন্ত্রী তারসিসিও দে ফ্রেইতাসও দেশটির সবচেয়ে জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাও পাওলো রাজ্যের গভর্নর হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।
এবার নির্বাচিত ৫৪ জন সিনেটরের মধ্যে ৩৪ জনই ডানপন্থী বা কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
ব্রাসিলিয়ায় সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে ফ্লাভিও বলেন, এই ফল লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির ‘একটি যুগের অবসানের’ ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার দাবি, লুলা সাতবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়েছেন এবং তার মূল লক্ষ্য ক্ষমতায় থাকা। অন্যদিকে ফ্লাভিও ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত বলে মন্তব্য করেন।
সাও পাওলোতে লুলা প্রথম দফায় জয় না পেলেও সমর্থকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ব্রাজিলের গণতন্ত্র থেকে এই নির্বাচন একটি শিক্ষা দিয়েছে। প্রথম দফাতেই জয়ী হওয়ার বিষয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন বলেও জানান। তবে এখন দ্বিতীয় দফার জন্য নতুন করে প্রচারণা চালানোর কথা বলেন তিনি।
লুলা বলেন, দ্বিতীয় দফার প্রচারণায় ভোটারদের সামনে ফ্লাভিওর ‘অন্ধকার অতীত’ তুলে ধরা হবে। দুই প্রার্থীর মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ায় তাঁদের প্রস্তাব ও রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য জনগণের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভোট দেওয়ার আগে লুলা বলেছিলেন, লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র ব্রাজিল এবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি। এ সময় তিনি ফ্লাভিওর সঙ্গে রিও ডি জেনেইরোর অপরাধজগতের কিছু ব্যক্তির কথিত যোগাযোগের বিষয়ও সামনে আনেন।
লুলা ২০০২ সালে ব্রাজিলের প্রথম নির্বাচিত শ্রমিক শ্রেণির প্রেসিডেন্ট হন। ২০০৬ সালে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর ২০২২ সালে আবারও ক্ষমতায় ফেরেন। এবারের নির্বাচনে তিনি চতুর্থবারের মতো, তবে ধারাবাহিক নয় এমন মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করছেন।
লুলার মিত্ররা এই নির্বাচনকে কট্টর ডানপন্থী আন্দোলনের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হিসেবে দেখছেন। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলা জাইর বলসোনারোকে পরাজিত করার পর ফল পাল্টে দেওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় ব্রাসিলিয়ায় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা হয়েছিল।
ফ্লাভিওর নির্বাচনী প্রচারণায় তার বাবাকে মুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজয় মেনে না নিয়ে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে জাইর বলসোনারো বর্তমানে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি ব্রাজিলের ভোটাররা ২৭টি রাজ্যের গভর্নর, নিম্নকক্ষের ৫১৩ সদস্য এবং ৮১ আসনের সিনেটের ৫৪ সদস্য নির্বাচন করেছেন। বলসোনারোপন্থীদের কাছে সিনেট নির্বাচন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা শুধু সিনেটের রয়েছে।
রিও ডি জেনেইরোর বামপন্থী এলাকা লারাঞ্জেইরাসে লুলার শত শত সমর্থক প্রথম দফায় তাঁর জয় উদ্যাপনের আশায় জড়ো হয়েছিলেন। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে ফ্লাভিওর ব্যবধান ধরে রাখার খবর আসতে থাকায় সেখানে হতাশা নেমে আসে।
ফ্লাভিওর পক্ষে ভোট দেওয়া ৩১ বছর বয়সী ফার্মেসিকর্মী ইতালো আন্দ্রাদে দোস সান্তোস বলেন, তিনি আশা করেছিলেন ফ্লাভিও প্রথম দফাতেই জিতবেন। তবে ফ্লাভিও এগিয়ে থাকায় তিনি সন্তুষ্ট। তার ভাষায়, তিনি মূলত লুলাকে ক্ষমতা থেকে সরাতেই ভোট দিয়েছেন। নির্বাচনের শেষ সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শহরাঞ্চলের সহিংসতা নিয়েও ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল।
এবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লুলা অভিযোগ করেছেন, ফ্লাভিওর পক্ষে ভোট প্রভাবিত করতে ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে। অন্যদিকে ফ্লাভিও ট্রাম্পের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আগামী ২৫ অক্টোবরের দ্বিতীয় দফার ভোটেই নির্ধারিত হবে; লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ ব্রাজিলের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হচ্ছেন।
সূত্র: গার্ডিয়ান
বসির আহমেদ