কাবুলে সাবেক মার্কিন দূতাবাসের সামনে তালেবানের সাঁজোয়া যান নিয়ে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বিভিন্ন পতাকা ও ব্যানার প্রদর্শন করা হয়। তালেবান সরকার দিনটিকে পশ্চিমা আধিপত্য থেকে ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
এক ভিডিও বার্তায় তালেবানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজউদ্দিন হাক্কানি বলেন, ‘মনোবল, সাহস ও সৃষ্টিকর্তার সহায়তার’ ফলেই তারা আবার ক্ষমতায় ফিরতে পেরেছেন। তবে বিরল এক স্বীকারোক্তিতে তিনি বলেন, এখনো কিছু ‘সমস্যা ও জটিলতা’ রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘ বলছে, গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তান যেসব প্রাকৃতিক ও মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, সেগুলো মোকাবিলায় তালেবান সরকার হিমশিম খাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেশটিতে নারী ও মেয়েদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে তালেবানের সেই প্রতিশ্রুতি দ্রুতই ভেস্তে যায় বলে অভিযোগ করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। ২০২১ সালের পর থেকে নারী ও মেয়েদের ওপর ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৫ লাখ আফগান নারী ও কিশোরীকে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের চলাচলের স্বাধীনতাও সীমিত করা হয়েছে।
তবে তালেবান দাবি করে, ইসলামী শরিয়াহ আইন অনুযায়ী তারা নারীদের অধিকারকে সম্মান করে।
ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পরও তালেবান সরকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। এখন পর্যন্ত শুধু রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এদিকে একসময় তালেবানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কও এখন উত্তেজনাপূর্ণ। পাকিস্তান অভিযোগ করছে, কাবুল পাকিস্তানি বিদ্রোহীদের সমর্থন দিচ্ছে।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর কাবুলে অনেক দেশের সাবেক দূতাবাস এখনো কার্যত খালি পড়ে আছে। এর মধ্যে রয়েছে শনিবারের তালেবান আয়োজনের পটভূমি হিসেবে ব্যবহৃত সাবেক মার্কিন দূতাবাসটিও।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, তালেবান ধীরে ধীরে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি অর্জন করছে। আফগানিস্তানে নিজেদের প্রভাবের সীমা এবং তালেবান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে কয়েকটি দেশ তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমঝোতার পথও খুঁজছে তালেবান। এসব দেশ আফগান নাগরিকদের নিজ নিজ দেশ থেকে বহিষ্কারের উপায় খুঁজছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক চুক্তি করার চেষ্টা করছে কাবুল।
তালেবানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমুখপাত্র জিয়া আহমদ তাকাল রয়টার্সকে জানিয়েছেন, পাকিস্তান, চীন, উজবেকিস্তান, ইরান, তুরস্ক ও মালয়েশিয়ার রাজধানীতেও সরকারের পঞ্চম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে।
কাবুলের শনিবারের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ২৮ বছর বয়সী দোকান মালিক নাজিবুল্লাহ ঘোরজাং বলেন, ‘আশা করি, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় আফগানিস্তান উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা একটি বড় সাম্রাজ্যকে পরাজিত করেছি, আবারও তাদের পরাজিত করব।’
শুক্রবার সংস্থাটি জানায়, আফগানিস্তানে মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা এখন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। দীর্ঘস্থায়ী খরা, ভয়াবহ ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রতিবেশী ইরান ও পাকিস্তান থেকে আফগান নাগরিকদের ব্যাপকভাবে ফেরত পাঠানোর কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
আইআরসি জানিয়েছে, বিদেশি সহায়তার পরিমাণ কমে গেলেও ২০২১ সালের তুলনায় মানবিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে—এমন আফগানের সংখ্যা ৩৫ লাখ বেড়েছে।
আফগানিস্তানে জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি জর্জেট গ্যানন বলেন, ‘টেকসই শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য শুধু সংঘাতের অনুপস্থিতিই যথেষ্ট নয়।’
তিনি বলেন, ‘আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার ওপর, যেখানে সব আফগানের অধিকার ও সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটবে।’
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর বহু আফগান নাগরিকের জীবন-জীবিকা সংকটে পড়েছে। তাদেরই একজন ২৮ বছর বয়সী ফাতিমা।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর তিনি ইরানে পালিয়ে যান। সেখানে মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন। আফগানিস্তানে তালেবান নারীদের এ ধরনের কাজ নিষিদ্ধ করেছে। তবে গত বছর ইরান থেকে তাকে বহিষ্কার করে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়।
ফাতিমা বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবি, কীভাবে মৌলিক জীবনযাত্রার খরচ মেটাব। আর প্রতি রাতে চোখ বন্ধ করার সময় সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করি।’
ক্ষমতার পাঁচ বছর পূর্তিতে তালেবান যখন নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও অর্জনের বার্তা দিচ্ছে, তখন দেশটির মানবিক সংকট, নারীদের অধিকার এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রশ্নগুলোই তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে।
সূত্র: রয়টার্স
বসির আহমেদ