ঢাকা | বঙ্গাব্দ

৬ মাসের ইরানযুদ্ধে কে কতো ক্ষতিগ্রস্ত, উঠে এলো চাঞ্চল্যকর ৬ তথ্য

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 27, 2026 ইং
৬ মাসের ইরানযুদ্ধে কে কতো ক্ষতিগ্রস্ত, উঠে এলো চাঞ্চল্যকর ৬ তথ্য ছবির ক্যাপশন:
ad728

সামরিক হামলা চালিয়ে ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করা কঠিন—এমন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র এখন দেশটির ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মিত্রদের জানিয়েছেন, আপাতত নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনা কম। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধের ছয় মাসে যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সেগুলো তুলে ধরেছে রয়টার্স।

১. রাজনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে ট্রাম্পকে

যুদ্ধের শুরু থেকেই মার্কিন জনগণের বড় অংশ এর বিরোধিতা করছিল। সময়ের সঙ্গে সেই বিরোধিতা আরও বেড়েছে। রয়টার্স/ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর ট্রাম্পের অনুমোদন ৪০ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ শতাংশে নেমেছে। এর পেছনে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিও বড় ভূমিকা রাখছে।

২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প আমেরিকানদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই প্রতিশ্রুতি চাপে পড়েছে। জরিপে মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিনি যুদ্ধকে সমর্থন করেছেন।

নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের জন্যও বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যেও বিভাজন তৈরি হয়েছে—এক পক্ষ দ্রুত সংঘাতের অবসান চায়, অন্য পক্ষ ইরানের ওপর সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে।

২. বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা, তবে আশঙ্কার চেয়ে কম

ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ। যুদ্ধের শুরুতে এই নৌপথে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়।

তবে ক্ষতির মাত্রা প্রাথমিক আশঙ্কার চেয়ে কম হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দুবার কমিয়েছে। এখন সংস্থাটি চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতি ৩ শতাংশ হারে বাড়বে বলে আশা করছে, যেখানে জানুয়ারিতে পূর্বাভাস ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।

তবু ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের তুলনায় এবার বৈশ্বিক অর্থনীতি বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। উন্নত দেশগুলো এখন আগের তুলনায় কম জ্বালানি-নির্ভর। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ ও ব্যয় অর্থনীতিকে ধাক্কা সামলাতে সহায়তা করছে।

৩. ইরান ক্ষতিগ্রস্ত, কিন্তু পরাজিত নয়

যুদ্ধে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে দেশটির হাতে এখনো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে এবং তারা হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতাও ধরে রেখেছে।

মে মাসে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের ১৬১টি নৌযান ধ্বংস করেছে এবং দেশটির ৮২ শতাংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর করে দিয়েছে। ইরানের বিমানবাহিনীও আগের মতো নিয়মিত অভিযান চালাতে পারছে না।

তবে ইরান এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালাতে সক্ষম। আঞ্চলিক জাহাজ চলাচল ও মার্কিন সামরিক স্থাপনাও হামলার লক্ষ্য হয়েছে।

যুদ্ধের কারণে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে এবং ইরানের অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। জুলাইয়ে দেশটির খাদ্য মূল্যস্ফীতি বছরে ১২৮ শতাংশে পৌঁছেছে বলে ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিভাজন সাময়িকভাবে পেছনে পড়ে গিয়ে বিরোধীদের ওপর সরকারের দমন-পীড়ন আরও কঠোর হয়েছে।

৪. অস্থিতিশীল হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য, ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা

ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য হুমকি হিসেবে মোকাবিলা করাই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এর পরিবর্তে অঞ্চলটি আরও অনিরাপদ হয়ে উঠেছে এবং ইরান আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক ও কূটনৈতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যাহত হয়েছে বিমান চলাচলও।

অন্যদিকে জাহাজে ইরানের হামলা এবং লোহিত সাগরে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে হুথিদের অবরোধ আঞ্চলিক পরিবহন ও বীমা ব্যয় বাড়িয়েছে। এর প্রভাব সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও পড়েছে এবং উপসাগরীয় অর্থনীতিগুলোর অনিশ্চয়তা বেড়েছে।

৫. ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে আরও সময় লাগতে পারে

২০২৫ সালের জুনের আগের হামলা এবং বর্তমান যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের তিনটি পরিচিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং অস্ত্র তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা কয়েকটি স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েলি হামলায় দেশটির কয়েকজন শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানীও নিহত হয়েছেন।

মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে ইরানের একটি পরমাণু অস্ত্র তৈরির উপযোগী পরিমাণে বিভাজ্য পদার্থ উৎপাদনে প্রায় ছয় মাস সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। এখন সেই সময় এক বছর পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

তবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির প্রকৃত অবস্থা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। জাতিসংঘের পরিদর্শকেরা ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে ফিরতে পারেননি। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ২০২৫ সালের হামলার পর থেকে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থান যাচাই করতে পারেনি।

ইরান অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই পরমাণু অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

৬. কমেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি

যুদ্ধে ইরানি হামলা ও দুর্ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন ও সামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মে মাসের কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সংঘাতে ৪২টি মার্কিন সামরিক বিমান হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

গোলাবারুদের মজুতও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু নির্দিষ্ট ধরনের নির্ভুল নিশানার ক্ষেপণাস্তরের বৈশ্বিক মজুতের প্রায় পুরোটাই ব্যবহার করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী, জুলাইয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রায় ৬৫ শতাংশ ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছে এবং থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত অন্তত ৩৮ শতাংশ কমেছে।

ইউরোপ ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে দীর্ঘ সময় ধরে মোতায়েন রাখতে হচ্ছে মার্কিন বাহিনীকে এবং অন্যান্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সব মিলিয়ে, ছয় মাসের এই যুদ্ধ সামরিক সংঘাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি, ইরানের অর্থনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলছে। সংঘাতের শেষ কোথায়—এখনো তার স্পষ্ট উত্তর নেই।

সূত্র: রয়টার্স


নিউজটি পোস্ট করেছেন : বসির আহমেদ

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ