প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে বাজারে আসা ইউনিট্রির শেয়ার ১ হাজার ১০০ ইউয়ান দরে লেনদেন শুরু হয়। পরে কিছুটা দর কমে প্রায় ৯০০ ইউয়ানে লেনদেন হচ্ছিল। চীনের ‘ন্যাসডাক’ হিসেবে পরিচিত স্টার মার্কেটে ইউনিট্রির তালিকাভুক্তিকে দেশটির রোবট শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউনিট্রির আনুষ্ঠানিক নাম ইউশু টেকনোলজি কোং লিমিটেড। চীনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর হাংজুতে প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর। সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় বাহু, চার পায়ের রোবট থেকে শুরু করে মানুষের মতো দেখতে হিউম্যানয়েড রোবট তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি পেয়েছে।
গত বছর প্রতিষ্ঠানটি ৫ হাজার ৫০০টির বেশি হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহ করেছে। একই সঙ্গে ইউনিট্রি শিল্পটির হাতে গোনা কয়েকটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানের একটি। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি ২৭ কোটি ৮০ লাখ ইউয়ান নিট মুনাফা করেছে।
ইউনিট্রির সাফল্যের অন্যতম কারণ তুলনামূলক কম দাম। প্রতিষ্ঠানটির রোবট কুকুরের দাম শুরু হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ ডলার থেকে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ডায়নামিকসের চার পায়ের ‘স্পট’ রোবটের দাম প্রায় ৭০ হাজার ডলার।
ইউনিট্রি ২০২৩ সাল থেকে হিউম্যানয়েড রোবট বিক্রি করছে। পরের বছর বাজারে আসে শিশু আকৃতির ‘জি১’ মডেল, যার দাম প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ ডলার। অন্যদিকে টেসলাসহ যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো তাদের হিউম্যানয়েড রোবটের বাণিজ্যিক সরবরাহ শুরু করতে পারেনি।
চীনের সরকার রোবট শিল্পকে উন্নত প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেওয়ার কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে। সরকারি সহায়তায় ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটিতে রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যার কারণে ভবিষ্যতে শ্রমিক সংকট দেখা দিতে পারে। সেই সংকট মোকাবিলায় কারখানা, হাসপাতাল এমনকি ভবিষ্যতে বাসাবাড়িতেও রোবট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব বাথের সহযোগী অধ্যাপক ফেই কিনের মতে, ‘রোবটই সেই জায়গা, যেখানে এআই পর্দা ছেড়ে অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে।’
রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন গত জুলাইয়ে জাতীয় নিরাপত্তা ও মার্কিন উৎপাদনশিল্প সুরক্ষার কারণ দেখিয়ে নতুন চীনা তৈরি হিউম্যানয়েড ও চার পায়ের রোবট নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়।
তবে বেইজিং এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য ইস্যুকে রাজনৈতিকীকরণের অভিযোগ তোলে।
এদিকে ইউনিট্রির আইপিওর আগে প্রতিষ্ঠানটির রোবট নিয়ে ব্যাপক প্রচারণাও হয়েছে। বেইজিংয়ে চলমান ২০২৬ ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমসে ইউনিট্রির রোবট দৌড়, ফুটবল, বাক্স খোলা এবং লাইব্রেরির বই সাজানোর মতো বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে চীনের স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল গালায় ইউনিট্রির জি১ রোবটের মার্শাল আর্ট প্রদর্শনী ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইউনিট্রির শেয়ারবাজারে অভিষেক হিউম্যানয়েড রোবট খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে। ইউনিট্রির পর লেজু রোবোটিকস ও অ্যাজিবটসহ আরও কয়েকটি চীনা রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানও আগামী মাসগুলোতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে।
তবে বাসাবাড়িতে রোবটের ব্যাপক ব্যবহার এখনো কয়েক বছর দূরে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতার মতো বিষয়গুলোতে আরও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে।
রোবট গবেষক ডেভিড সু-এর মতে, রোবট শিল্পে যুক্তরাষ্ট্র তার নেতৃত্ব হারিয়েছে—ইউনিট্রির শেয়ারবাজারে অভিষেক যেন সেই পরিবর্তনেরই নতুন বার্তা।
সূত্র: বিবিসি
বসির আহমেদ