গবেষকদের মতে, সাম্প্রতিক রেকর্ডসংখ্যক তাপপ্রবাহের কারণে নদী, হ্রদ, জলাধার, মাটি ও উদ্ভিদ থেকে অস্বাভাবিক হারে পানি বাষ্পীভূত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পশ্চিম ইউরোপে এমন পরিস্থিতির সম্ভাবনা প্রায় ৮০ গুণ এবং পূর্ব ইউরোপে প্রায় ৪০ গুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির দূষণের কারণে মাটির শুষ্কতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, খরা বলতে এতদিন মূলত বৃষ্টির ঘাটতিকেই বোঝানো হতো। কিন্তু পশ্চিম ইউরোপে গত শীত মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ার পরও এবারের গ্রীষ্মে ভয়াবহ খরা দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ইউরোপে খরার প্রকৃতি বদলে দিচ্ছে এবং উচ্চ তাপমাত্রাই এখন সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে উঠছে।
খরার কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পানির ব্যবহার সীমিত করতে জরুরি বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। দক্ষিণ ইংল্যান্ডের অধিকাংশ এলাকায় হোসপাইপ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্পেন ও ফ্রান্সে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে, আর কৃষি খাত পড়েছে বড় ধরনের সংকটে।
নদ-নদীর পানি কমে যাওয়ায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলেও সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। নেদারল্যান্ডসের রাইন নদীর পানির স্তর ১৯৭৬ সালের ঐতিহাসিক খরার সময়ের চেয়েও নিচে নেমে গেছে। গবেষকদের সতর্কবার্তা, এর প্রভাবে খাদ্য ও জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন আয়ের মানুষ।
গবেষণা দলের সদস্য ড. ডমিনিক শুমাখার বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা শোষণের ক্ষমতাও দ্রুত বাড়ছে। ফলে নদী, হ্রদ, জলাধার ও মাটি থেকে দ্রুত পানি হারিয়ে যাচ্ছে এবং গ্রীষ্ম শুরু হওয়ার আগেই মাটি অস্বাভাবিকভাবে শুকিয়ে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৬ সালের খরা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় দুই মাস আগেই শুরু হয়েছে। বছরের শুরুতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকায় উদ্ভিদ দ্রুত বেড়ে ওঠে, কিন্তু পরে অতিরিক্ত তাপে সেগুলো শুকিয়ে গিয়ে দাবানলের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
গবেষক ড. মারিয়াম জাকারিয়া বলেন, বর্তমানে বৈশ্বিক তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ভবিষ্যতে তা ২ দশমিক ৮ ডিগ্রিতে পৌঁছালে এ ধরনের চরম শুষ্ক পরিস্থিতির সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো না হলে ইউরোপকে বারবার এমন ভয়াবহ গরম ও খরার মুখোমুখি হতে হবে।
জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিল বলেন, ক্রমবর্ধমান খরা পৃথিবীর অতিরিক্ত উষ্ণ হয়ে ওঠার স্পষ্ট সতর্কসংকেত। তিনি বলেন, কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর না হলে জলবায়ুজনিত খরা আরও তীব্র হবে এবং এর অর্থনৈতিক ক্ষতিও বাড়বে।
ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বিজ্ঞানীরা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ এবং জলবায়ু মডেল ব্যবহার করে বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে এমন একটি কাল্পনিক বিশ্বের তুলনা করেছেন, যেখানে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটেনি। তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনই ২০২৬ সালের ইউরোপের খরাকে উল্লেখযোগ্যভাবে আরও তীব্র করে তুলেছে।
এদিকে গবেষকদের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুনের শেষের ভয়াবহ তাপপ্রবাহ জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া ঘটাই সম্ভব ছিল না। ওই তাপপ্রবাহে ইউরোপে প্রায় ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে শুধু অতিরিক্ত গরমের কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়ে অর্থনীতিতে এক বিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে পৃথক এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বসির আহমেদ