মরক্কোর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে সাব-সাহারান আফ্রিকার ১০৯ জন অভিবাসী এবং দুই মরক্কোর নাগরিক রয়েছেন। মরক্কোর সেউতার বিপরীত পাশে অবস্থিত ফনিদেক শহর ও এর আশপাশ থেকে তাদের আটক করা হয়।
স্পেনের সংবাদ সংস্থা ইএফই জানিয়েছে, সীমান্ত থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরের পাহাড়ে জড়ো হওয়া অভিবাসীদের ছত্রভঙ্গ করতে মরক্কোর পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। পরে ফনিদেকের বাইরে পাহাড়ি এলাকা থেকে শত শত পুলিশ সদস্যকে ফিরতে দেখা যায়। তাদের কেউ দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের পোশাকে এবং কেউ সাদা পোশাকে ছিলেন।
ইএফই ও স্পেনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম টিভিই জানিয়েছে, মরক্কোর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের সাংবাদিকদের অবিলম্বে ফনিদেক ছাড়ার নির্দেশ দেয়। তবে এর কোনো কারণ জানানো হয়নি।
সেউতায় স্প্যানিশ সেনারা বিভিন্ন সুপারমার্কেট পাহারা দিচ্ছেন। শহরের প্রধান সড়কগুলোতেও ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। গত ৩০ জুলাইয়ের প্রাণঘাতী অভিবাসী প্রবেশের ঘটনার পর কয়েকদিনের তুলনায় বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত।
এরই মধ্যে মাদ্রিদ সেউতার উপকূলে একটি সামুদ্রিক প্রতিবন্ধক স্থাপন করেছে এবং স্পেনের মূল ভূখণ্ড থেকে ৫০০ জনের বেশি অতিরিক্ত পুলিশ পাঠিয়েছে। ফলে সেউতায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি হয়েছে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা জানিয়েছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী এসব অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন থাকবে। তিনি বলেন, স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে এবং ৩০ জুলাইয়ের মতো ঘটনা পুনরায় ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্ত্রী জানান, সেউতায় এখনো প্রায় ৫ হাজার অভিবাসী অবস্থান করছেন। রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, তাদের কয়েকশ মানুষ তীব্র গরম থেকে বাঁচতে এল ত্রাম্পোলিন শহুরে সৈকতে বাঁশের অস্থায়ী আশ্রয়ে অবস্থান করছেন।
এর আগে চলতি সপ্তাহে মরক্কোর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৫ আগস্ট ব্যাপকভাবে সীমান্ত পার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে অজ্ঞাত উৎস থেকে ছড়ানো পোস্ট ও বার্তাগুলো তারা নজরদারিতে রেখেছে। এসব আয়োজনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ ভ্যান, কাঁটাতারের ঢাল ও বিভিন্ন সড়কে তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে। স্পেনের আরেক উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড মেলিলার আশপাশেও একই ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
কর্তৃপক্ষ কাসাব্লাঙ্কা, ফেজ ও কেনিত্রার মতো শহর থেকে উত্তর মরক্কোর দিকে যাওয়া ট্রেন ও বাসে কয়েকটি অভিবাসী দলের ওঠা ঠেকিয়েছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সাব-সাহারান আফ্রিকার কিছু অভিবাসী পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে ফনিদেকের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
গত ৩০ জুলাই সেউতায় প্রবেশ করা অনেক তরুণ শুক্রবার তারাজাল সৈকতে মাছ ধরা, সাঁতার কাটা ও গোসল করছিলেন।
ফেজের ২২ বছর বয়সী দ্রিস সাদিক জানান, সেউতায় পৌঁছাতে তাকে পাঁচ ঘণ্টা সাঁতার কাটতে হয়েছিল। তিনি অন্যদের এমন ঝুঁকি না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, যারা সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের প্রতি তার পরামর্শ—‘এখন পার হবেন না। আপনারা শুধু দুর্ভোগে পড়বেন।’
১৭ বছর বয়সী আদিল জামিলও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তার ভাষ্য, যারা সেউটায় প্রবেশ করছেন, তারা সেখানে গিয়ে তেমন কোনো সুবিধা পাবেন না; বরং মানুষের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে এবং সবার জন্য সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।
জামিলের দাবি, ব্যাপকভাবে সীমান্ত পার হওয়ার এসব ঘটনা আগে থেকেই পরিকল্পিত। নির্দিষ্ট একটি তারিখ ঠিক করে ফনিদেকে জড়ো হয়ে দলবদ্ধভাবে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করা হয়।
তিনি বলেন, ‘আমি যদি বাবা-মায়ের সঙ্গে থেকে যেতাম, তাহলে ধীরে ধীরে মারা যেতাম। কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যদি এখানে আসতে পারি এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারি, তাহলে সেটাই ভালো।’
সূত্র: রয়টার্স
বসির আহমেদ