এআই নিয়ে গত সপ্তাহে গবেষকদের একের পর এক সতর্কবার্তার পর আমোদেইয়ের আহ্বানে বিরল এক ঐক্য দেখালেন প্রযুক্তি খাতের প্রতিদ্বন্দ্বী শীর্ষ ব্যক্তিরা। অ্যানথ্রপিকের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী আমোদেই এক নিবন্ধে কেন এআই শিল্পের উন্নয়নের গতি কমানো উচিত, তা তুলে ধরেছেন। এ জন্য তিনি তিন দফা পরিকল্পনাও প্রস্তাব করেছেন।
তার পরিকল্পনার প্রথম ধাপে এআই নির্মাতাদের গবেষণা ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের নিয়মিত প্রবেশাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমোদেই মনে করেন, ‘খুব দ্রুত এআই তৈরি করা বেপরোয়া সিদ্ধান্ত’। তার আশঙ্কা, এআইয়ের সক্ষমতা বাড়লেও যদি নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ যথাযথভাবে নিশ্চিত না হয়, তাহলে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে তিনি চলতি গ্রীষ্মে ওপেনএআইয়ের শত শত এআই এজেন্টের হাগিং ফেস ওয়েবসাইটে সাইবার হামলার ঘটনাটি উল্লেখ করেন। তার আশঙ্কা, একই ধরনের কিন্তু আরও শক্তিশালী এআইয়ের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক সক্রিয় হলে তা স্থায়ী বটনেটের মাধ্যমে পুরো ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে এবং এতে শত শত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। তবে কয়েকজন এআই বিশেষজ্ঞ এই আশঙ্কাকে খুব একটা সম্ভাব্য নয় বলে মনে করেছেন এবং বিষয়টি সংশয়ের সঙ্গে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন।
টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক আমোদেইয়ের পরিকল্পনাকে সমর্থন করে এক্সে লেখেন, ‘দারিও ঠিক বলেছেন।’ তিনি বলেন, এআই নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন। ২০১৪ সালের একটি পোস্টের কথা উল্লেখ করে মাস্ক বলেন, এআই নিয়ে ‘খুব সতর্ক’ থাকা প্রয়োজন এবং এটি পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও সম্ভাব্যভাবে বিপজ্জনক হতে পারে।
অন্যদিকে, ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যানও আমোদেইয়ের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছেন। তিনি বলেন, এআইয়ের সর্বাধুনিক পর্যায়ের উন্নয়নের গতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। স্বাধীন মূল্যায়নকারীদের কর্মীদের মতো পর্যায়ে এআই ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার দেওয়ার ধারণাকেও তিনি সমর্থন করেন।
অল্টম্যান আরও জানান, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে ২০২৬ সালে ওপেনএআইকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা নেই। তার ভাষায়, এআই নিরাপত্তা নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে এখনই কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। গুগল ডিপমাইন্ডের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডেমিস হাসাবিসও বলেন, পরিকল্পনার বিস্তারিত বিষয়গুলো নিয়ে আরও কাজ করতে হবে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দিকনির্দেশনা সঠিক।
আমোদেইয়ের পরিকল্পনায় মার্কিন সরকারের কাছ থেকে বিশেষ অনুমতির কথাও বলা হয়েছে, যাতে শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতাবিরোধী সমঝোতার অভিযোগে শাস্তির ঝুঁকি ছাড়াই নিরাপত্তা নিয়ে সমন্বয় করতে পারে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের সহসভাপতি ডেভিড স্যাকস এ উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, এআই ধীর করার পেছনে নিরাপত্তার পাশাপাশি বড় ধরনের আইনি ও ব্যবসায়িক দায়ের আশঙ্কাও রয়েছে।
এদিকে, এআই নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন আইন ও বিধিনিষেধের দাবিও জোরালো হচ্ছে। এআই এজেন্টের অনিয়ন্ত্রিত আচরণ, বহিরাগত সিস্টেমে সাইবার হামলার ঘটনা এবং প্রযুক্তিটির ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেক গবেষক প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দিয়েছেন।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও ডেমোক্র্যাট নেতাদের এআই ব্যবস্থাপনা ও নজরদারিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বলে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, প্রযুক্তিটি দ্রুতগতিতে ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতে এগোচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, অ্যানথ্রপিকের উপদেষ্টা ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকও এআই নিরাপত্তাকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, গবেষণায় সীমা নির্ধারণে সরকারগুলো ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
এর আগে অ্যানথ্রপিকের সাবেক কর্মী জ্যাকব কক্সন সতর্ক করেছিলেন, এআই ২০৩০ সালের মধ্যেই মানবজাতির বিলুপ্তির কারণ হতে পারে। তবে আমোদেই তার সঙ্গে পুরোপুরি একমত না হলেও স্বীকার করেছেন, এআইয়ের কারণে কিছু ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তিনি ‘এআই নিয়ে হতাশাবাদী’ নন এবং এই প্রযুক্তি নিরাপদভাবেই তৈরি করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করেন।
সূত্র: গার্ডিয়ান
বসির আহমেদ