শোলাকিয়ায় ১৯৯তম ঈদ জামাতে লাখো মুসল্লির অংশগ্রহণ
-
নিউজ প্রকাশের তারিখ :
Mar 21, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন:
লাখো মুসল্লির অংশগ্রহণ ও কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ঐতিহ্যবাহী ঈদগাহ ময়দানে। শোলাকিয়ায় এটি ছিল ঈদুল ফিতরের ১৯৯তম জামাত। শনিবার (২১ মার্চ) সকাল ১০টায় শুরু হয় জামাত। এতে ইমামতি করেন মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ। নামাজ শেষে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ, মুসলিম উম্মাহর শান্তি এবং দেশের সমৃদ্ধি কামনা করে মোনাজাত করা হয়।
সকাল ৭টার আগেই কিশোরগঞ্জ শহরের শোলাকিয়া এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়। চার স্তরের নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ছাতা, লাঠিসোঁটা, দিয়াশলাই বা লাইটার নিয়ে মাঠে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এসব বাইরে রেখে মুসল্লিদের মাঠে প্রবেশ করতে হয়। প্রত্যেক মুসল্লিকে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করে মাঠে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। রেওয়াজ অনুযায়ী নামাজ শুরুর আগে বন্দুকের গুলির মাধ্যমে সংকেত দেওয়া হয়। ১৫ মিনিট আগে তিনটি, ১০ মিনিট আগে দুটি এবং পাঁচ মিনিট আগে একটি গুলি ছোড়া হয়। এ কার্যক্রম পরিচালনা করে জেলা পুলিশ। ভোর থেকেই নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত এই ঈদগাহ মাঠে মুসল্লিদের ঢল নামে। ঈদগাহমুখী সব রাস্তাঘাট মুসল্লিতে ভরে যায়। কয়েক ঘণ্টার জন্য শহরের সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জামাত শুরুর প্রায় এক ঘণ্টা আগেই সাত একর আয়তনের মাঠ কানায় কানায় ভরে যায়। অনেকে মাঠে জায়গা না পেয়ে পাশের সড়ক, ফাঁকা জায়গা, নদীর পাড় এবং আশপাশের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন। নারীদের জন্য শহরের সরযূবালা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে পৃথক ঈদ জামাতের আয়োজন করা হয়। সেখানেও বহু নারী ঈদের জামাতে অংশ নেন। নামাজ শুরুর আগে মুসল্লিদের স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দেন কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য বস্ত্র ও পাটপ্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক ও ঈদগাহ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল। ২০১৬ সালে শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলা হয়। এর পর থেকেই এই ঈদগাহে বাড়তি সতর্কতা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এবারও ছিল নজিরবিহীন নিরাপত্তা। চার প্লাটুন সেনাবাহিনী, পাঁচ প্লাটুন বিজিবি, প্রায় ১১০০ পুলিশ, শতাধিক র্যা ব সদস্য, এপিবিএন ও আনসার সদস্য মাঠে দায়িত্ব পালন করেন। ড্রোন ক্যামেরা ও সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়। মাঠে ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার বসানো হয়। অ্যান্টি-টেররিজম ও বোম ডিসপোজাল ইউনিটও মোতায়েন ছিল। শোলাকিয়া মাঠ ও শহরের অলিগলিতে বসানো হয় নিরাপত্তা চৌকি। দায়িত্ব পালন করেন ১৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। মাঠে ছিল তিনটি অ্যাম্বুলেন্সসহ মেডিক্যাল টিম ও অগ্নিনির্বাপণ দল। বিপুল সংখ্যক স্কাউট সদস্য স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করেন। ঈদের জামাতে কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, স্থানীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা, পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেনসহ জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। শোলাকিয়া ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা জানান, এবার দুই লক্ষাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করেছেন বলে তাদের ধারণা। ঈদের কয়েক দিন আগেই কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা ও দেশের নানা জেলা থেকে বহু মুসল্লি এখানে চলে আসেন। অনেকে হোটেলে থাকেন, আবার কেউ আত্মীয়দের বাড়িতে ওঠেন। ঈদের দিন মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে দুটি বিশেষ ট্রেন চালু করা হয়। একটি ট্রেন ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে এসে সকাল ৮টায় কিশোরগঞ্জ পৌঁছায়। অন্যটি ময়মনসিংহ থেকে সকাল পৌনে ৬টায় ছেড়ে সকাল সাড়ে ৮টায় কিশোরগঞ্জে পৌঁছায়। নামাজ শেষে যাত্রীদের নিয়ে আবার ফিরে যায় ট্রেন দুটি। জনশ্রুতি অনুযায়ী, মোঘল আমলে এখানকার পরগনার রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল শ লাখ টাকা। মানে এক কোটি টাকা। কালের বিবর্তনে শ লাখ থেকে বর্তমান শোলাকিয়া হয়েছে। অন্য আরেকটি বিবরণে রয়েছে, ১৮২৮ সালে শোলাকিয়া ঈদগাহে সোয়া লাখ মুসল্লি একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করেন। সেই থেকে ঈদগাহটি একসময় শোয়ালাকিয়া ও পরে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
নিউজটি পোস্ট করেছেন :
বসির আহমেদ
কমেন্ট বক্স